নানামুখী গুজবে সয়লাব রাজধানী। সর্বত্রই এখন প্রশ্ন—১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনটা হবে তো? অবশেষে নির্বাচন কি হয়েই যাচ্ছে? নির্বাচনের দিন বিস্তর মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি হবে কিনা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না হলে পরিস্থিতি কী হবে—এমন নানা আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে।
কোনও কোনও দল পরাজয় আঁচ করতে পেরে নির্বাচনের দিন দুপুরেই নির্বাচন বয়কট করে মাঠে নেমে অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন গুজবও ছড়িয়েছে। সংসদ নির্বাচনে পরাজয় আন্দাজ করতে পেরে অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে যাবেন—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীরা ভোল পাল্টে কোনও দলে ভিড়বেন কিনা, ভোটের পর কবে পাওয়া যাবে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল, ভোটের পর এমপিদের কে শপথ পড়াবেন, কীভাবে নতুন সরকার গঠিত হবে, নতুন সরকারকে কে কোথায় শপথ পড়াবেন—এসব প্রশ্নও চলছে মুখে মুখে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কি আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবেন, তিনি যদি ক্ষমতা ছাড়তে না চান তাহলে কী হবে, বর্তমান উপদেষ্টাদের শেষ কর্মদিবস কবে—এ ধরনের নানাবিধ প্রশ্নও এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে। পাড়ামহল্লা, অফিস-আদালত, এমনকি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানেও এসব নিয়ে চলছে আলোচনা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই জনমনে একটাই প্রশ্ন ছিল—কবে হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন? এ নিয়ে তখন জনমনে ধারণা ছিল, সহসাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। গত বছরের ৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান ব্রিটিশ সংসদ সদস্য রূপা হক। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে জানান, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত হবে।
পরে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তফশীল ঘোষণা করেন। এরপরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা—এ নিয়ে নানা ধরনের গুজব চলতে থাকে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ততই নানামুখী গুজব ডালপালা মেলতে থাকে। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। তবুও থেমে নেই নানা ধরনের গুজব।
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জনমনে নানা প্রশ্ন দানা বাঁধছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই নিশ্চিত করা হয়েছে, কেউ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। একটি মহল নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চায়, সরকার যে কোনও মূল্যে তাদের প্রতিহত করবে। মাঠপর্যায়ে সরকারের মুখপাত্র জেলা প্রশাসকরা জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। কোনও প্রকার হুমকি নেই বলেও জানিয়েছেন তারা। দেশে নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরাও সরকারের কাজে সহযোগিতা করছে।
রাজধানীর পুরানাপল্টন এলাকায় অটোরিকশাচালক মো. ইব্রাহিম তোপখানা রোডে এই প্রতিবেদককে বলেন, নির্বাচনের দিন ঝামেলা হতে পারে—এই আশঙ্কায় তিনি সেদিন কাজে নামবেন না। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই, সবাই ক্ষমতায় যেতে চাইবে—এতে মারামারি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভোট হবে—এটা নিশ্চিত হলেও ফলাফল কবে দেওয়া হবে তা নিশ্চিত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফলাফল দিতে সময় লাগতে পারে। তাই ভোটে কারচুপির অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্টাফ হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উপদেষ্টারা বিদায় নিতে শুরু করলেও তাদের শেষ অফিস কবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। নির্বাচনের দিন তারা কোথায় থাকবেন বা কী করবেন, সেটিও পরিষ্কার নয়। ফলাফল কবে পাওয়া যাবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। সব মিলিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা কাটেনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হেমায়েত আলী বলেন, ভোটের দিন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যাবে কিনা—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠে বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মারমুখী মনোভাব এই সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, বেলা ১২টার পর যে দল বুঝবে তারা হারছে, তারা নির্বাচন বয়কট করতে পারে। এমন হলে সারাদেশে বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বশির উদ্দিন বলেন, নির্বাচনের পর বিজয়ী এমপিদের কে শপথ পড়াবেন—তা স্পষ্ট নয়। স্পিকার নেই, ডেপুটি স্পিকার দুর্নীতির মামলায় কারাগারে। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। নতুন সরকার কবে এবং কীভাবে গঠিত হবে, তাও পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে ড. ইউনূস আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবেন—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, যা রহস্যজনক।
আইডিয়াল কলেজের শিক্ষক মো. কামাল হোসেন বলেন, ভোটের দিনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে অনেক গুজব ছড়িয়েছে, যেগুলোর সমাধান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ভোটের দিন নির্বাচন কমিশন ও সরকার যৌথভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বিক পরিস্থিতি মনিটর করবে। তিনি বলেন, সচেতন নাগরিকদের কোনও ধরনের গুজবে কান দেওয়া উচিত নয়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিদায় নেবে। উপদেষ্টারা ইতোমধ্যে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কাজ গুছিয়ে নিয়েছেন এবং সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন।
গুজবে কান না দিয়ে ভোটের দিন দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।