নির্বাচন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের ১৯ সুপারিশ  

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৫৪আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:২৪


ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইইউ-ইওএম) গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনের ওপর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে। এই প্রতিবেদনটি দুই মাস ধরে সারা দেশ পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

এতে সম্পূর্ণ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরার পাশাপাশি ১৯টি সুপারিশ প্রদান করেছে—যার লক্ষ্য হলো, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যাপারে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভবিষৎ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় করা।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইইউ-ইওএম’র প্রধান পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবস প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এই বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা সব অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি একটি যৌথ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। যদিও নির্বাচন জনআস্থা বৃদ্ধি করেছে, তবু আইনগত ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি রয়ে গেছে, যা জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর পরবর্তী সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।”

প্রতিবেদনে মিশনটি বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার প্রমাণ বহন করে। পুনর্গঠিত আইনি কাঠামো অনেকাংশেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করেছে, স্বচ্ছতা প্রদর্শন করেছে। বিদেশে বসবাসরত প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার ভোটার সফলভাবে ভোটাধিকার প্রদান করেছে, নির্বাচনি তথ্য ও নিষ্পত্তি কমিটিগুলো প্রচারণার নিয়মাবলি বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। মিশনটি নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা লক্ষ্য করেছে এবং ভুল তথ্য প্রতিরোধের লক্ষ্য গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির জন্য আরও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি নগণ্য বললেই চলে—যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে ইঙ্গিত করে। নির্বাচন কমিশনের প্রচারণা বিষয়ক বিধিবিধান প্রয়োগে অসঙ্গতি এবং প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত আইনের সীমিত তদারকি ও জবাবদিহি একটি অসম নির্বাচনি পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সংঘটিত সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা এবং পুলিশের অপর্যাপ্ত সুরক্ষা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে। সেই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্যের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রস্তুতিও অপর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের নির্বাচনি অংশীজনদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক অটল অঙ্গীকারকে তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে, এটি আরও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো—আইনি নিশ্চয়তা জোরদার করা, নির্বাচনি সততার সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অগ্রগতি সাধন করা। ভবিষ্যৎ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো সমুন্নত রাখার জন্য ইইউ-ইওএম ১৯টি সুপারিশ প্রদান করেছে। তার মধ্যে ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশ হচ্ছে—

১. সংসদীয় নির্বাচন পারিচালনাকারী আইনি কাঠামো সংশোধন করা, যাতে অসঙ্গতি ও ফাঁকফোকর দূর করা, বিভাজন হ্রাস, আইনি নিশ্চয়তা জোরদার করা যায় এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও নিবিড় সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা যায়।

২. উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভোট গণনার সময় স্বচ্ছতা বজায় রাধার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যেমন- স্ক্রিনে ডেটা এন্ট্রি প্রদর্শন এবং সম্পূর্ণ প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ফলাফল অনলাইনসহ দ্রুত প্রকাশ করা।

৩. ২০৩০ সালের মধ্যে সব রাজনৈতিক দল যেন সব অভ্যন্তরীণ দলীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য অর্জন করে। তা নিশ্চিত করার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর ধারা বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে—এটি সংশোধন করা: এবং জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে কমপক্ষে এক- তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে বাধ্য করার বিষয়টি বিবেচনা করা।

৪. তথ্যগত ও নির্বাচনি সততা রক্ষার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ সংশোধন করে—একটি অধিকতর নিরাপদ ও স্বচ্ছ ডিজিটাল জগৎকে উৎসাহিত করা।

৫. নির্বাচনি প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত বিধানগুলো পর্যালোচনা ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে ব্যয়ের সীমা ও প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবসম্মত প্রয়োগযোগ্য এবং কার্যক্রম যাচাই ও তদারকির আওতাধীন হয়। আরপিও প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি আদর্শ ফরমেটে নিরীক্ষিত নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে বাধ্য করতে পারে। প্রচারণা চলাকালীন ও তার পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে।

৬. বিদ্যমান অখণ্ড সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখে এবং অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা অন্বেষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশে যেসব ভোটার নির্বাচনের দিনে সশরীরে ভোট দিতে অক্ষম, যেমন- গৃহে আবদ্ধ ভোটার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তচ্যুত ব্যক্তি, অভিবাসী শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের যোগ্যতা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা। অন্যান্য শ্রেণির ভোটারদের ভোটাধিকার প্রদানের উপযোগী আগাম অতিরিক্ত ভোটদানের ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

/এসও/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধিকে যেভাবে দেখছে ভারত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপনের নীতিমালায় পরিবর্তন আনছে ইসি 
আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
নকলের সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে হামলা এবং বিপজ্জনক তারুণ্য 
নকলের সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে হামলা এবং বিপজ্জনক তারুণ্য 
কাতারের সাবেক আমিরের প্রয়াণে দোহার উদ্দেশে স্পিকার
কাতারের সাবেক আমিরের প্রয়াণে দোহার উদ্দেশে স্পিকার
বিএনপি নেতার কামড়ে কান ছিঁড়ে গেছে ব্যবসায়ীর, লেগেছে ৪ সেলাই
বিএনপি নেতার কামড়ে কান ছিঁড়ে গেছে ব্যবসায়ীর, লেগেছে ৪ সেলাই
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি, ডিএসসিসির সপ্তাহব্যাপী উৎসব
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি, ডিএসসিসির সপ্তাহব্যাপী উৎসব
সর্বাধিক পঠিত
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বাংলাদেশিদের ভ্রমণ স্থগিতে আইনি নোটিশ
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বাংলাদেশিদের ভ্রমণ স্থগিতে আইনি নোটিশ
কেন শিবির ছাড়লেন সাদিক কায়েম
কেন শিবির ছাড়লেন সাদিক কায়েম
বাতিল হচ্ছে ৬ মার্চেন্ট ব্যাংকের নিবন্ধন সনদ 
বাতিল হচ্ছে ৬ মার্চেন্ট ব্যাংকের নিবন্ধন সনদ 
শিবির ছাড়ার ঘোষণা সাদিক কায়েমের
শিবির ছাড়ার ঘোষণা সাদিক কায়েমের
সেজদা, নামাজ, রোজা: ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের নয়া উত্থান
সেজদা, নামাজ, রোজা: ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের নয়া উত্থান