অল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে ১৮ কোটির বেশি মানুষকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়াধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ভোক্তার অধিকার। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবছরের মতো এবারও দেশে রবিবার (১৫ মার্চ) পালিত হচ্ছে জাতীয় ও বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। এবছর দিবসটির প্রদিপাদ্য “নিরাপদ পণ্য, আত্মবিশ্বাসী ভোক্তা”।
দেশব্যাপী দিবসটি পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। দিবস উপলক্ষে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সারাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তদারকি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে আরও রয়েছে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১৫ মার্চ বিশ্বব্যাপী ভোক্তা অধিকার দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল লক্ষ্য ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এ বছর রমজান ও বাণিজ্যমেলার কারণে দিবস উপলক্ষে গত ৫ মার্চ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ বাজার তদারকি পরিচালনা করা হয়েছে।
অধিদফতরের প্রধান কাজ
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়াধীন একটি আধা-বিচারিক সংস্থা। এটি ভোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ, নিষ্পত্তি এবং বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্যক্রম প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতারিত হলে গ্রাহকের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ ও আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা। নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নকল বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি রোধ করা। ভোক্তাদের সচেতন করতে সেমিনার ও প্রচারণা চালানো। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
অভিযোগের প্রক্রিয়া
ভোক্তারা সরাসরি মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। এছাড়া ১৬১২১ হটলাইন (২৪ ঘণ্টা) এবং info@dncrp.gov.bd ই-মেইলের মাধ্যমেও অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। অধিদফতরের ওয়েবসাইটেও (dncrp.com) অভিযোগ দাখিল করা যায়অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী ক্ষতিপূরণ হিসেবে পান।
জনবল মাত্র ১০৮
কাজের তুলনায় সংস্থাটির জনবল অত্যন্ত কম। অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সংস্থাটিতে মোট জনবল ১০৮ জন। ১৮ কোটির বেশি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে এই জনবল খুবই সীমিত।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ভেজাল প্রতিরোধ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সঠিক ওজন ও মান বজায় রাখতে কাজ করে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী নিরাপদ পণ্য ও সঠিক সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য।
জেলা-উপজেলায় কার্যক্রম
অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটি সারাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পণ্য কেনার সময় মেয়াদ, মূল্য ও মান যাচাই করার বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন করা হয়।
নির্ধারিত মূল্যের বেশি দাম নেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল পণ্য বিক্রি, কিংবা ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ জেলা বা উপজেলা প্রশাসন এবং ভোক্তা অধিকার দফতরে করা যায়। এজন্য ভোক্তাকে কেনাকাটার রশিদ সংরক্ষণ করতে হয়।
সীমাবদ্ধতা
অধিদফতর বলছে, কার্যক্রম পরিচালনায় কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জনবল সংকট; ঢাকা-কেন্দ্রিক কার্যক্রম; মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত দফতরের অভাব; ই-কমার্স খাতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি।
এছাড়া অভিযোগ দায়েরের ৩০ দিনের সময়সীমা, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ভোক্তা সচেতনতার অভাবও কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।
আইন সংশোধনের উদ্যোগ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সংশোধনের উদ্যোগ বর্তমান সরকারও অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর লক্ষ্য মজুতদারি, ই-কমার্স প্রতারণা, ভেজাল এবং অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে দুই বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সার্বিক কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগও রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা
সরকার ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ২০০৯ সালের আইন আরও কঠোর করা; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তদারকি বৃদ্ধি; ই-কমার্স খাতে ভোক্তা প্রতারণা রোধে ব্যবস্থা; হটলাইন ১৬১২১-এর মাধ্যমে অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি; স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি জোরদার।
যা বলছেন কর্মকর্তারা
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিদ্যমান আইন সংশোধনের কাজ চলছে। আইনটি সংশোধন করা গেলে নাগরিক সেবা আরও বাড়বে। আমরা ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও করছি।”
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “আগামী ১৫ মার্চ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দিবস। প্রতিবছরের মতো এ বছরও দিবসটি পালন করা হবে। এর মূল লক্ষ্য ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।”
তিনি আরও জানান, আইন সংশোধনের মাধ্যমে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার বিধানসহ বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।