চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরে (ডিএফপি) তথ্যচিত্র নির্মাতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে 'কালচার অ্যান্ড ফিল্ম কালেক্টিভ'। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্মাতারা গত ৩০ মার্চের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং জড়িত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমানসহ বহিরাগত হামলাকারীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহিন ফারুক আমিনের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আলোকচিত্রশিল্পী সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহিদুল আলম। তিনি হামলার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা না নেওয়ার সুযোগ নেই। যেখানে ডিএফপিতে প্রকাশ্যে এসব হচ্ছে, তাদের ধরা কঠিন কেনো? এটা নিয়ে সরকার নির্বিকার কেনো। তারা সিন্ডিকেটের হওয়ায় কি সরকারের চেয়েও ক্ষমতাশালী। দেশ কে চালাচ্ছে সেই প্রশ্ন করতে হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘হামলার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয় কীভাবে? এটি নিয়ে কোনও তদন্ত হয়েছে কিনা আর কতটা ক্ষমতা থাকলে এটা গায়েব হয় জানি না। যদি বিচার না করেন আমরা দেখে নেবো কিভাবে করা যায়।’’
নাট্যকর্মী ঋতু সাত্তার বলেন, ‘‘জুলাই পরবর্তী সময়জুড়ে আমরা একটি মবোক্রেসি দেখে এসেছি। ডিএফপিতে কয়েকজনের ওপর হামলা মানে শিল্প সংস্কৃতির ওপর হামলা। এমনভাবে শক্তি দেখানো হচ্ছে যেনো কেউ কথা না বলে। পরিচালককের রুমে এ ধরনের ঘটনা ঘটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’’
কালচার এন্ড ফিল্ম কালেক্টিভের লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল আদায়ের দাবিতে গত ৩০ মার্চ ডিএফপি কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন একদল নির্মাতা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ওই প্রকল্পের প্রযোজক ও সরকারি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাধা দেন। বিষয়টি নিয়ে ডিএফপির মহাপরিচালকের (ডিজি) সামনে আলোচনা চলাকালে মশিউর রহমান উপস্থিত নির্মাতাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত হন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে কোনও উসকানি ছাড়াই ৩০-৪০ জন বহিরাগত সন্ত্রাসীকে এনে ডিজির কক্ষের সামনেই নির্মাতাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে নির্মাতা মোহাম্মদ গোলাপ শাহ, আবদুর রহমান, নাসিফ ফারুক আমিন ও মোশফিকুর রহমান জোহানসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ছবি দেখে সনাক্ত করা হামলাকারীদের মধ্যে রয়েছেন- হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আতিকুর রহমান, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম, একই ইউনিটের সাবেক আহ্বায়ক সদস্য দিদারুল ইসলাম দিদার, আসাদুল ইসলাম এবং ছাত্রদল কর্মী জীবন আহমেদ হামলা করেন।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, হামলার পর রমনা থানায় অভিযোগ দিলেও ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও মামলাটি নথিভুক্ত (রজু) হয়নি। এছাড়া ডিএফপির কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে সিসিটিভি ফুটেজ ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এ সময় আন্দোলনকারীদের ৬ দফা দাবি পেশ করেন। সেগুলো হলো- অভিযুক্ত মো. মশিউর রহমানকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা। হামলায় অংশ নেওয়া বহিরাগত সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করে অবিলম্বে গ্রেফতার। নিখোঁজ সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। আহত নির্মাতাদের সুচিকিৎসা ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান। সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য নিরাপদ কাজের পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
ইতোমধ্যে ডিএফপি কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত মশিউর রহমানকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করেছে (স্মারক নং ৫১৩৩)। তবে সংবাদ সম্মেলনে নির্মাতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শুধুমাত্র সাময়িক বরখাস্তই যথেষ্ট নয়; জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ বিচার ও স্থায়ী বহিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহীন ফারুক আমিন, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন এবং মানবাধিকার কর্মী মুশফিক রহমান প্রমুখ।