তীব্র তাপপ্রবাহ কর্মক্ষমতা ও জনস্বাস্থ্যকে সংকটে ফেলছে

বাংলাদেশে গ্রীষ্মের শুরুতেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় পারদ ইতিমধ্যেই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। এই চরম দাবদাহের মধ্যেই জীবিকার তাগিদে লাখ লাখ মানুষ ঘরের বাইরে কাজ করছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই তীব্র তাপপ্রবাহ একদিকে যেমন মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বাড়িয়ে তুলছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

সাধারণত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গরম অনুভূত হয়, যার মধ্যে এপ্রিল ও মে মাসে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকছে, আর এর সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা জনজীবনকে করে তুলছে ওষ্ঠাগত।

সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কায়িক শ্রম বা শারীরিক পরিশ্রমকে আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ক্রান্তীয় দেশগুলোতে এই প্রভাব অনেক বেশি।

ঢাকার রাজপথে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন কর্মী ও হকারদের প্রচণ্ড রোদে কাজ করতে দেখা যায়। তীব্র গরমের মধ্যেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে তারা কাজ বন্ধ রাখতে পারেন না। মাঝেমধ্যে অল্প বিরতি বা পানি পান করে শরীরকে সচল রাখার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় রোদে থাকায় তাদের ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এবং হিট-স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রবল হচ্ছে। 

২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৫৬টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, গড় তাপমাত্রা ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে মানুষের শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়। বাংলাদেশের জন্য এই হার ৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষ হাঁটাচলা, ব্যায়াম বা স্বাভাবিক নড়াচড়া কমিয়ে দিচ্ছে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব (শহরের তাপমাত্রা আশপাশের তুলনায় বেশি হওয়া), যানজট এবং পর্যাপ্ত গাছপালার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শারীরিক সক্রিয়তা কমে গেলে বাংলাদেশে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো অসংক্রামক ব্যাধির (এনসিডি) বোঝা আরও বাড়বে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুর প্রায় ৫ শতাংশের কারণ শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর কয়েক লাখ অতিরিক্ত অকাল মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে ২ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বা অফিসে থাকার সুযোগ আছে, তারা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষরা সরাসরি এই ঝুঁকির মুখে। এছাড়া নারীরা নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে শরীরচর্চার সুযোগ কম পাওয়ায় তাদের চ্যালেঞ্জ আরও বেশি।

গবেষণার প্রধান লেখক গার্সিয়া-উইটুলস্কি বলেন, “শারীরিক সক্রিয়তা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, এটি জলবায়ুর ওপরও নির্ভরশীল। তাই চরম তাপপ্রবাহের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে শহরগুলোর নকশা পরিবর্তন, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী মূল্যের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শরীরচর্চাকেন্দ্র তৈরি এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে দাবদাহের সময় সুস্থ থাকার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি।