চৈত্র সংক্রান্তি: বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মিলনমেলা

ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে মহাকালের গভীর গর্ভে বিলীন হতে চলেছে আরেকটি বাংলা বছর। চৈত্রের দহনদগ্ধ প্রখর দুপুরে, শুকনো পাতার মৃদু নূপুরধ্বনি যেন বাজিয়ে তোলে বিদায়ের এক বিষণ্ন সুর, সেই সুরে মিশে থাকে নতুনের আহ্বান, নবজাগরণের নীরব প্রতিশ্রুতি। বিদায় ও আগমনের এই অনির্বচনীয় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি; যা বাংলার মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের এক গভীর প্রতীক।

চৈত্রের শেষ দিন আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল)। তাই সে বিদায় নেবে। কাল আসবে বৈশাখ। চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্র সংক্রান্তি। এ দিন বাংলা বর্ষেরও শেষ দিন। পরের দিন নতুন বাংলা বর্ষ ১৪৩৩।

বৈশাখের আগমনের পূর্বে চৈত্র মাস থেকে বর্ষার সূচনালগ্ন পর্যন্ত সূর্যের তীব্র তাপমাত্রা বিরাজ করলে সেই তাপ প্রশমিত করা এবং বৃষ্টির কামনায় প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিনির্ভর মানুষ চৈত্র সংক্রান্তির প্রচলন করে আসছে। প্রাচীন বাংলার নানাবিধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বহন করে আসছে এই চৈত্র সংক্রান্তি। বছরের অন্তিম দিন হিসেবে পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসব। কথিত আছে, চৈত্র সংক্রান্তিকে অনুসরণ করেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এত আয়োজন। তাই চৈত্র সংক্রান্তিকে বলা হয় বাঙালির আরেক বড় উৎসব।

চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে থাকছে নানাবিধ আয়োজন। এই দুই উৎসবকে ঘিরে গ্রহণ করা হবে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা। এসব কার্যক্রম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে।

চৈত্র সংক্রান্তি পালনের রীতি-অনুষ্ঠানে অঞ্চল অনুযায়ী ভিন্নতা থাকলেও এর মূল বার্তা এক, ঐতিহ্যের ধারাবাহিক স্রোত। যুগের পর যুগ, দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালির জীবনযাপন, আস্থা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে এই দিনটি। এক সময় এটি পার্বত্য জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বজনীন উৎসবে,ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ছাড়াই সব মানুষের অংশগ্রহণে এটি অর্জন করেছে সার্বজনীন স্বীকৃতি। পার্বত্য জনগোষ্ঠী এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসবের মাধ্যমে চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে স্বাগত জানায়; যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির এক বর্ণিল উপস্থাপন।

গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশে চৈত্র সংক্রান্তির আবেশ যেন আরও গভীর ও সজীব হয়ে ওঠে। বিগত বছরের সব দুঃখ-কষ্ট, হতাশা ও অপূর্ণতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে জনপদ। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে পুরোনো হিসাব-নিকাশ শেষ করে নতুনভাবে ‘হালখাতা’ শুরু করার যে রীতি, তা যেন নতুন শুরুরই এক প্রতীকী প্রকাশ। খাদ্য সংস্কৃতিতেও এই দিনের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। আমিষ পরিহার করে নিরামিষ ভোজনের যে প্রচলিত ধারা, তা এখনও চলমান। কোথাও কোথাও ১৪ ধরনের শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ প্রস্তুতের প্রথা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এক প্রতীকী রূপ। আবার কিছু অঞ্চলে ছাতু খাওয়ার প্রচলনও এই দিনের ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। চৈত্র মাসে রোগব্যাধি বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে তেঁতো ও শাকসবজি গ্রহণের যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে, তা কেবল একটি বিশ্বাস নয় বরং এটি প্রাচীন জীবনদর্শনের প্রতিফলন, যেখানে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি একসূত্রে আবদ্ধ।

সনাতন ধর্মের অনুসারীদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। উপবাস পালন, শিবের আরাধনা এবং বিভিন্ন বিধি-নিষেধ অনুসরণের মধ্য দিয়ে তারা দিনটিকে উদযাপন করে। মন্দির বা ঘরে পূজা-পার্বণের পাশাপাশি সন্ধ্যার আঁধারে জ্বলে ওঠা প্রদীপ যেন আগামীর আলোর দিশারী ভবিষ্যতের শান্তি ও সমৃদ্ধির নীরব প্রার্থনার প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চৈত্র সংক্রান্তির রূপেও এসেছে ভিন্নতা, বিশেষ করে নগর জীবনে। তারপরও গ্রামীণ সংস্কৃতির উপাদান আজও হারিয়ে যায়নি। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, যাত্রাপালা, লোকগান ও নৃত্যের আয়োজন এই দিনটিকে করে তোলে প্রাণচঞ্চল। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদের উদ্যোগে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে বাঙালির শিকড়ের ইতিহাস।

এ বছরও চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দিনটি উদযাপিত হবে বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এরই অংশ হিসেবে আজ সোমবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে লোকশিল্প প্রদর্শনী। প্রায় ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, যা সৃষ্টি করবে উৎসবের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসের আবহ। খোলা মঞ্চে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় ধামাইল নৃত্য ঐতিহ্যের সুরে দর্শকদের মুগ্ধ করে তুলবে।

অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পরিবেশিত হবে লোকসংগীত জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠ, যা বাংলার লোকজ সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভান্ডারকে নতুন দৃষ্টিতে তুলে ধরবে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গান ও নৃত্যের পরিবেশনা এই আয়োজনকে বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করে তুলবে। লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারার অংশ হিসেবে মঞ্চে উপস্থাপিত হবে যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’, যা দর্শকদের মনে জাগিয়ে তুলবে গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা রূপকথার মায়া।

এছাড়াও চৈত্র মাসের অন্তিম দিনে চাকমা সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে ‘পাজন’ নামে বিশেষ এক রান্নার আয়োজন করা হয়। পাজন হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি এক ধরনের তরকারি। এদিন বাড়িতে আগত বন্ধু ও অতিথিদের এই পাজন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। তাদের বিশ্বাস, বছরের শেষ দিনে নানা সবজি দিয়ে রান্না করা খাবার গ্রহণ করলে কল্যাণ বয়ে আনে এবং নতুন বছরে শুভ সূচনা ঘটে।

অন্যদিকে, পুরান ঢাকায় বহুদিন ধরে চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পালিত হয়ে আসছে ঘুড়ি উৎসব। এদিন আকাশ ভরে ওঠে নানা রঙ ও নকশার বিচিত্র ঘুড়িতে।

এদিকে চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে লোকসংগীত, নৃত্যসহ বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমনকে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করা হবে।