বহু বছর ধরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে শোভাযাত্রা। বহুবার এর নাম পরিবর্তন হলেও এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শোভাযাত্রাটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে—যশোরে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’, ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। তিন দশকেরও বেশি সময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এবং বর্তমানে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’—তবু এর উৎসবমুখরতা কখনোই কমেনি।
প্রতিটি রাজনৈতিক ও নাম পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে আছে শোভাযাত্রার আমেজ। এর মধ্যে রয়েছে মোটিফ, ঢাকের বাদ্য, পেইন্টিং এবং গণমানুষের অংশগ্রহণ। যেটি শুরু হয়েছিল বাংলা ঐতিহ্য উদযাপন এবং এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী অবস্থান হিসেবে, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি শোভাযাত্রায় পরিণত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে নাম পরিবর্তন কখনোই এর প্রভাবকে কমাতে পারেনি।
শোভাযাত্রার ইতিহাস
ভাস্কর মাহবুব জামিল শামীমের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রাটি প্রথম শুরু হয় ১৯৮৫ সালে যশোরে। ‘চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ নামের একটি সংগঠনের ব্যবস্থাপনায় এটি ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৪০০ জন অংশ নেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের তত্ত্বাবধানে শোভাযাত্রা শুরু হয়।
১৯৮৯ সালে তৎকালীন ‘চারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউট’র (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) শিক্ষার্থীরা এই ঐতিহ্যকে রাজধানীতে নিয়ে আসেন। এমনটাই জানান চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক এ.এ.এম. কাওসার হাসান। তিনি বলেন, “শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ এবং এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন হিসেবে।”
নামের পরিবর্তন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শোভাযাত্রাটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হয়। তখন চারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক রফিকুন নবীর নেতৃত্বে এটি পরিচালনার জন্য ১০১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে ছিলেন ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ড. সন্জীদা খাতুন, তার স্বামী ওয়াহিদুল হক এবং বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) ডিজাইনার এমদাদ হোসেন।
২০১৭ সালে মাহবুব জামিল শামিম বলেছিলেন, ১৯৯০ সালে ছায়ানটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক এবং শিল্পী এমদাদ হোসেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি প্রস্তাব করেন। খুব দ্রুতই এটি জনপ্রিয় হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
৩৫ বছর ধরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে চলার পর, গত বছর জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শোভাযাত্রাটির নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখা হয়।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বর্ষবরণ উদযাপন কমিটি শোভাযাত্রার আগের নামের দাবি জানায়, যেটি কিনা ১৯৮৯ সালে প্রথম র্যালিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বাভাবিক।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম চঞ্চল বলেছিলেন, “আমরা নাম পরিবর্তন করছি না। আমরা কেবল উৎসবের সূচনালগ্নে ব্যবহৃত মূল নামটি পুনরুদ্ধার করছি।”
তিনি আরও বলেন, “মঙ্গল শব্দটি ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই আমরা মূল চেতনায় ফিরে যেতে চাই—যেখানে সব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে এবং সংস্কৃতির নামে রাজনৈতিক আগ্রাসন থাকবে না।”
চলতি বছর শোভাযাত্রার নাম আবার পরিবর্তন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। গত ৫ এপ্রিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। ওই দিন তিনি জানান, সরকার ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ এবং ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’—দুটো নামই পরিত্যাগ করবে।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা এটিকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বলে ডাকবো না। শোভাযাত্রাটি কেবল ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত হবে।”
চলতি বছরের প্রতিপাদ্য ও অংশগ্রহণ
এই বছরের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। শোভাযাত্রার মোটিফগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি মোরগ, যা গণতান্ত্রিক ভোরের প্রতীক; একটি হাতি, যা সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী মোটিফের স্মারক; একটি পায়রা, যা শান্তির প্রতীক; একটি টেপা পুতুল-ঘোড়া, যা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে ও একটি দোতারা, যা বাউল সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
চলতি বছরের শোভাযাত্রা শুরু হবে পুলিশের অশ্বারোহী দল দিয়ে। এরপর জাতীয় পতাকা বহনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবেন। এরপর সাংবাদিকরা মিছিল করবেন, তারপর প্রধান ব্যানার নিয়ে এগিয়ে যাবেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এর পরেই থাকবেন বিভিন্ন অনুষদের ডিন এবং আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্টরা, তারপর বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা অংশ নেবেন।
এরপর একসঙ্গে মিছিল করবে জাসাস (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) এবং জাতীয় কবিতা পরিষদ, এরপর পাঁচটি বড় মোটিফ, ঢাকের দল এবং ১৫০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং। সবার শেষে থাকবেন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং ১১৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।









