শাহবাগে নাগরিকদের ওপর হামলার নিন্দা: বিচার দাবিতে ৩৭০ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি

শাহবাগে সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছে নাগরিক সমাজ। এতে সই করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, ট্রান্সঅধিকারকর্মী, শিল্পী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের মোট ৩৭০ জন বিশিষ্ট নাগরিক। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ‘আজাদী আন্দোলনের’ ব্যানারে পরিচালিত হামলায় আড্ডারত একদল মানুষের ওপর ‘সমকামী’ ও ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে শারীরিক আক্রমণ চালানো হয়; একইসঙ্গে নারীদের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটে।

এর আগেও গত ৩ এপ্রিল একই স্থানে আড্ডারত দৃশ্যমান হিজড়া ও ট্রান্সনারী সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ‘মোবাইল সাংবাদিকতার’ নামে যৌন হয়রানি ও শারীরিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জোরপূর্বক ক্যামেরা ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে আপত্তিকর ও অযাচিত প্রশ্ন করতে থাকে। ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ জানিয়ে সরে যেতে চাইলে তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে হয়রানি অব্যাহত রাখা হয়। পরে কোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ছাড়াই আট জন হিজড়া ও ট্রান্সনারী ব্যক্তিকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়।

তারা দুই দিন পর্যন্ত কোনও আইনি সহায়তা বা আইনজীবীর সুযোগ পাননি এবং পুলিশি হেফাজতে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হন। পরে তাদের বিরুদ্ধে ‘পাচার’-সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয় এবং কোনও প্রমাণিত অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও জরিমানা ও মুচলেকার মাধ্যমে মুক্তি পেতে বাধ্য করা হয়। নাগরিকদের ওপর প্রকাশ্যে সংঘটিত এসব হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, ট্রান্সঅধিকারকর্মী, শিল্পী ও সমাজকর্মীসহ নাগরিক সমাজ তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

আমরা মনে করি, এই ঘটনাগুল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং লিঙ্গ, ভাষা, জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার হরণের লক্ষ্যে চলমান বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ‘আজাদী আন্দোলনের’ আড়ালে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই হামলায় সম্পৃক্ত ছিল। উপস্থিত অনেকেই গুরুতরভাবে আহত হন এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হন। ঘটনাস্থলে শিক্ষক, পেশাদার সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা ভুক্তভোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং হামলার প্রতিবাদ জানান।

ঘটনাটি শাহবাগ থানার নিকটবর্তী এলাকায় সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও নিষ্ক্রিয়তা, ভুক্তভোগীদের প্রতি অসহযোগিতা এবং মামলা গ্রহণে অনীহা গভীর উদ্বেগের বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে নারী, আদিবাসী, মাজারপন্থি এবং লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোরাল পুলিশিং এবং মব সহিংসতার মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে। আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক, তাদের লিঙ্গ পরিচয় বা যৌন অভিমুখিতা নির্বিশেষে, সমান সাংবিধানিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আমাদের দাবিগুলো হলো– ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা শাহবাগ থানার পুলিশ সদস্যদের অবহেলার জন্য অবিলম্বে জবাবদিহির আওতায় এনে আইনানগু ব্যবস্থা নিতে হবে; হামলায় জড়িত চিহ্নিত ব্যক্তিদের দ্রুত তদন্তের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমলূক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে হবে; আজাদী আন্দোলনের আড়ালে সক্রিয় উগ্রবাদী গোষ্ঠগুলোর বিরুদ্ধে আইনানগু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় নাগরিকদের অধিকার বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করতে হবে এবং বিদ্বেষমলূক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; মোবাইল সাংবাদিকতার নামে পরিচালিত বেআইনি ও হয়রানিমলূক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতিতে সই করেন– আনু মুহাম্মদ (সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়); খুশী কবির (সমনবয়কারী নিজেরা করি); শিরীন পারভিন হক (সদস্য, নারীপক্ষ); সাফিয়া আজীম (সজল্য, নারীপক্ষ); গীতা দাস (আন্দোলন সম্পাদক, নারীপক্ষ); মির্জা তাসলিমা সুলতানা (অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়); ওয়াকিলুর রহমান (দৃশ্য শিল্পী, কলাকেন্দ্র); ফাহমিদুল হক (সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); রীতু সাত্তার (শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা); জোবায়ের খান (আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ); রাজীব দত্ত (শিল্পী), ধীমান সরকার, (সহযোগী অধ্যাপক, চারুকলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়); তাহমিনা খানম (সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); রুশাদ ফরিদী (সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); সজীব তানভীর (স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য-এনপিএ, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস একশন-এনপিএ); কাজলী সেহরীন ইসলাম (শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); কাজী মারুফুল ইসলাম (অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); কামরুল হাসান মামুন (অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); সামিনা লুৎফা (অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); মোশাহিদা সুলতানা (সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); তাসনীম সিরাজ মাহবুব (সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); ফারাহ নাজ মুন (শিল্পী); মহাম্মাদ রাকিবুল হাসান (আলোকচিত্রী/ চলচ্চিত্র নির্মাতা); জান্নাতুল মাওয়া (আলোকচিত্রী); ওয়ারদা আশরাফ (উন্নয়ন ও সংস্কৃতিকর্মী); দীপ্তি দত্ত (সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); মহাম্মাদ সারোয়ার মোর্শেদ মনন (চিফ কোওর্ডিনেটর, লাস্টর দ্বীপ); অরূপ রাহী (সংগীতশিল্পী, গবেষক); খন্দোকার হাসিবুল কবির, মুক্তাশ্রী চাকমা (অধিকারকর্মী); মাহরুখ মোহিউদ্দিন (প্রকাশক, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড) ও অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিক।