জামিন জালিয়াতি

যেভাবে বেরিয়ে গেলেন ‘কুকি-চিনের’ পোশাক জব্দ মামলার প্রধান আসামি 

চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কুকি-চিন’-এর জন্য ২০ হাজার পোশাক তৈরির ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম জামিন জালিয়াতির মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। হাইকোর্টের জামিন আদেশের নথি ও তথ্য জালিয়াতির এই ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এরই মধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। 

যেভাবে সংঘটিত হলো জালিয়াতি 

সূত্র জানায়, প্রায় সাত মাস আগে চট্টগ্রামের ‘রিংভো অ্যাপারেলসের’ মালিক সাহেদুল ইসলাম হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য আসে।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, শুনানির সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মামলার এজাহার ও তথ্য উপস্থাপন করে আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়। ওই এজাহারে ‘কুকি-চিন’ সংশ্লিষ্টতার কোনও অভিযোগ ছিল না। ফলে আদালত সাহেদুলকে জামিন দেন এবং দুই বিচারপতি আদেশে সই করেন।

আসল জালিয়াতি ঘটে বিচারপতির সইয়ের পর। জামিন আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় থাকা মূল মামলার তথ্য, থানার নাম এবং অভিযোগের ধারা বদলে সেখানে কুকি-চিনের পোশাক জব্দের মামলার নম্বর ও ধারা বসিয়ে দেওয়া হয়। এই তৈরি করা ভুয়া আদেশ দাখিল করেই কারাগার থেকে মুক্ত হন সাহেদুল। 

জালিয়াতি ধরা পড়লো যেভাবে 

সাহেদুল জামিনে মুক্ত হওয়ার পর ওই মামলার আরেক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে এলে পূর্বের এই ‘নজির’ (সাহেদুলের জামিন প্রাপ্তি) আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখতে পায়, তালিকায় টেন্ডার নম্বর ও নামের মধ্যে সূক্ষ্ম জালিয়াতি করা হয়েছে। অনলাইন কার্য তালিকায় একই টেন্ডার নম্বর ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। 

প্রধান বিচারপতির নির্দেশ ও তদন্ত  

বিষয়টি উন্মোচিত হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নজরে আনেন। প্রধান বিচারপতি অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে ঘটনার তদন্ত করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তথ্য গোপন ও জালিয়াতির মাধ্যমে জামিনের ঘটনাটি সত্য। তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং দ্রুতই বিস্তারিত জানানো হবে।” 

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, আদালতের বেঞ্চ কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় জালিয়াতি সম্ভব নয়। এই চক্রটিকে নির্মূল করতে ঘটনার গভীরে গিয়ে তদন্ত প্রয়োজন। 

ঘটনার নেপথ্যে  

২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় ‘রিংভো অ্যাপারেসের’ গুদাম থেকে কেএনএফ-এর জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে এই পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় কারখানা মালিক সাহেদুল ইসলামসহ তিনজনকে আসামি করা হয়। উল্লেখ্য, বম জনগোষ্ঠীর একাংশ নিয়ে গঠিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি পাহাড়ের ‘বম পার্টি’ নামেও পরিচিত।