বাংলাদেশে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে গত তিন বছরে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে বাজেট কমেছে ৪০ শতাংশ। সরকারি অর্থায়নের ধারাবাহিক এই পতন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস'। সংগঠনটির দাবি, এই খাতে বরাদ্দ কমতে থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৬) অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বুধবার (২০ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট পর্যালোচনা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ উদ্বেগ জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ওয়াশ খাত নিয়ে একটি পলিসি ব্রিফ উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি বলেন, মাত্র তিন বছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে, যা জাতীয় উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধির বিপরীতে জনস্বাস্থ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক খাতে বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৯৮১ কোটি টাকায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ নেমে আসে ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকায় এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কসের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে ব্রিফটি প্রণয়ন করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং সিনিয়র ফেলো মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াটারএইড ও পিপিআরসির যৌথ বাজেট বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলা হয়, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও নিরাপদ ও দূষণমুক্ত সুপেয় পানি পাচ্ছে মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ জানান, শহর ও গ্রামের মধ্যে নিরাপদ পানির প্রাপ্তিতে বড় বৈষম্য রয়েছে। শহরে নিরাপদ পানির সুবিধা ৭১ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৮ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, মোট ওয়াশ উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই শহরাঞ্চল ও ওয়াসাগুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ওয়াসাই দেশের মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় ২৯ শতাংশ (৩,১৪০ কোটি টাকার বেশি) পেয়েছে।
এছাড়া সিটি করপোরেশনগুলোর ভেতরের বাজেট বণ্টনও অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। সিটি করপোরেশন তহবিলের ৬২ শতাংশের বেশি টাকা পেয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান—ঢাকা উত্তর (৩৫ শতাংশ) ও গাজীপুর (২৭.৫৯ শতাংশ)। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজশাহী, রংপুর, কুমিল্লা, সিলেট এবং ঢাকা দক্ষিণের মতো পাঁচটি প্রধান শহর কোনও বরাদ্দই পায়নি।
অন্যদিকে চর, হাওর, উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো জাতীয় ওয়াশ এডিপি তহবিলের মাত্র ১০ দশমিক ২২ শতাংশ বরাদ্দ পাচ্ছে বলে দাবি করা হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে খোলা স্থানে মলত্যাগের হার ২ শতাংশ হলেও, এই প্রান্তিক এলাকাগুলোতে তা এখনও ২ থেকে ৩ শতাংশে রয়ে গেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানের এই ব্যয় কাঠামো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাকে (ন্যাপ ২০২৩-২০৫০) সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপর্যুপরি বন্যার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ল্যাট্রিনগুলো উপচে পড়ে পানির উৎস দূষিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে হাজার হাজার সাবমারসিবল পাম্পের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত সেচকাজ এবং ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের উদ্যোগ না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।
এই সামগ্রিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ আগামী বাজেটের জন্য জরুরি বিনিয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে আছে-
বরাদ্দ হ্রাসের প্রবণতা বন্ধ করা: আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করতে এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ওয়াশ খাতের বাজেট বৃদ্ধির হারকে সামগ্রিক এডিপি বৃদ্ধির হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
আঞ্চলিক সমতা অনুযায়ী পুনর্বণ্টন: শহরকেন্দ্রিক মডেল থেকে সরে এসে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, দুর্গম পকেট এবং অবহেলিত প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোকে বাজেটে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সরাসরি ওয়াশ ভাতা চালু: জাতীয় ফ্যামিলি কার্ড বা হেলথ কার্ডের মাধ্যমে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা সরাসরি ওয়াশ ভাতা দিতে হবে। এই সরাসরি আর্থিক সহায়তা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে (বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে) বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য পানির ট্যাংক কিনতে, মৌলিক হাইজিন বজায় রাখতে এবং পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুর চিকিৎসার পেছনে পকেট থেকে হওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
স্কুল ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ: দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসায় জেন্ডার-বান্ধব পৃথক টয়লেট এবং ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনসহ সুনির্দিষ্ট ‘ওয়াশ ব্লক’ স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
ঐতিহ্যগত কর্মসূচির রূপান্তর: প্রচলিত গণপূর্ত কর্মসূচি যেমন জাতীয় খাল খনন কর্মসূচিকে স্থানীয়ভাবে পানির জলাধার তৈরির মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল ও দরিদ্র-বান্ধব ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে রূপান্তর করতে হবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য দেন, ইশরাত শবনম (এফএসএম নেটওয়ার্ক), মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (বিডব্লিউডব্লিউএ), রেবেকা সান ইয়াত (সিইউপি), মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (বাউইন), যোসেফ হালদার (ফানসা) এবং মো. ফজলুল হক (ইডব্লিউপি)।