বর্ষাকালেও কেন ঢাকায় বায়ুর মান এত খারাপ

বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কারণে সাধারণত বাতাসের ধুলাবালি ও ক্ষতিকর কণার পরিমাণ কমে যায়। এই সময়ে বায়ুদূষণ কম হওয়ার কথা থাকলেও চলতি মৌসুমে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় বারবার শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসছে ঢাকা। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বৃষ্টির মৌসুমেও কেন রাজধানীর বায়ুমান উন্নত হচ্ছে না?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির সাময়িক প্রভাব থাকলেও বায়ুদূষণের মূল উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে না আসায় ঢাকার বাতাস এখনও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়ে গেছে। রাজধানীজুড়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি এবং নির্মাণকাজ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ধুলাবালি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় পরিবহন এবং ধুলা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের প্রকাশিত বিশ্লেষণেও ঢাকার বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও বায়ুর মানমাত্রা নির্ধারণকারী যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) হিসেবে প্রায়ই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে অবস্থান করছে ঢাকা এবং শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় রয়েছে।

আইকিউএয়ারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য ইটভাটা, সড়কের ধুলাবালি ও বালু এবং যানবাহনের নির্গমন দায়ী। সংস্থাটি বলছে, বৃষ্টিপাত সাময়িকভাবে দূষণ কমালেও এসব উৎস থেকে নির্গমন অব্যাহত থাকায় রাজধানীর বায়ুমানে স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর আশপাশের ইটভাটা, শিল্পকারখানা এবং পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়াও দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় দূষণের মাত্রা বাড়ছে। এ ছাড়া বর্জ্য পোড়ানো এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের ব্যবহারও বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখছে।

তাদের ভাষ্য, বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে কিছু সময়ের জন্য বাতাসের ক্ষতিকর কণা ধুয়ে গেলেও বৃষ্টি থামার পর দ্রুতই দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষ করে যানজটপূর্ণ সড়ক, নির্মাণ এলাকা এবং শিল্পাঞ্চল-সংলগ্ন এলাকায় এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ কামরুজ্জামান বলেন, “দুই কারণে বর্ষাকালে ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, যেগুলো গ্যাসীয় বায়ুদূষণের কারণ। অপরটি হচ্ছে বর্ষাকালে খোঁড়াখুঁড়ি বেড়ে যায়। যখন বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়, তখন সেগুলো বায়ুদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

তিনি বলেন, “সরকারের উচিত এ সময় খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখা, পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা। একমাত্র আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই সরকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছাই জরুরি বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

এদিকে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বায়ুদূষণের কারণে মানবদেহের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বর্তমানে বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অ্যালার্জি, ঠান্ডা-কাশিতে ভোগা, নারীদের বিভিন্ন রোগের কারণও এই দূষণ। এমনকি এই বায়ুদূষণের কারণে গর্ভপাতের মতো ঘটনাও ঘটে।”

তাই এখনই বায়ুদূষণ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি বলে জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।