দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর চারটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের কয়েকটি নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি বা অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে এক দিনে দেশের চার বিভাগে বজ্রাঘাতে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময় দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য কোনও সতর্কসংকেত জারি করা হয়নি।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর ২টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের প্রকাশিত দৈনিক দুর্যোগ পরিস্থিতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১২৭টি পানি সমতল পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৮০টিতে পানি বেড়েছে। ৪৪টি স্টেশনে পানি কমেছে এবং দুটি স্টেশনে অপরিবর্তিত রয়েছে। একটি স্টেশনের তথ্য পাওয়া যায়নি। চারটি স্টেশনে তিনটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭১ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলিতে একই নদীর পানি সাত সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যের বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়েছে। আগামী দুই দিন এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে এবং পরবর্তী তিন দিন পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এর ফলে আগামী দুই দিন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদীর পানিও বাড়ছে। সোমেশ্বরী নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে এবং সারিগোয়াইন নদীর পানি কমছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংসসহ কয়েকটি নদীর পানি কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি কমছে এবং দুধকুমার নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। একই সময়ে গাইবান্ধায় তিস্তা ও কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ বিভিন্ন নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় কমতে পারে। এসব নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একদিনে জামালপুরে ২০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে জামালপুরে। এছাড়া রংপুরে ১৬৬ মিলিমিটার, কুড়িগ্রামে ১৪৩ মিলিমিটার, চট্টগ্রামে ১৩৩ মিলিমিটার, লামায় ১২৭ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জের ছাতকে ১২৫ মিলিমিটার, রংপুরের কাউনিয়ায় ১১১ মিলিমিটার এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ১০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জে ৯৫ মিলিমিটার, চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৯৩ মিলিমিটার, গাইবান্ধায় ৯৬ মিলিমিটার, ফরিদপুরে ৯৩ মিলিমিটার, ঢাকায় ৭৯ মিলিমিটার এবং ময়মনসিংহে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বজ্রপাতে পাঁচ জনের মৃত্যু
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুলাই রাত ১২টা থেকে ১২ জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত দেশে পাঁচটি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কেউ আহত বা নিখোঁজ হননি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকা বিভাগে একজন, ময়মনসিংহে একজন, খুলনায় দুজন এবং রংপুর বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে ওই সময়ে বজ্রপাতে কোনও প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি।
বজ্রপাতের সময় যেসব সতর্কতা মানতে হবে
বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে কয়েকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বজ্রপাত শুরু হলে ঘরের মধ্যে অবস্থান করতে এবং জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। সম্ভব হলে নিচু হয়ে নিরাপদ স্থানে বসতে হবে এবং গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
বজ্রপাতের সময় কম্পিউটার ব্যবহার না করা, কম্পিউটারের মডেম বা বৈদ্যুতিক সংযোগে হাত না দেওয়া এবং বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জলাশয় থেকে দ্রুত উঠে আসতে, বিদ্যুৎ পরিবাহী বস্তু থেকে দূরে থাকতে এবং শিলাবৃষ্টির সময় ঘরে অবস্থান করতেও বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে অতি ভারী বর্ষণেরও আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য কোনও সতর্কসংকেত নেই। তবে ভারী বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।