রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৪আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৪

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সাম্প্রতিক ভূমিধসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ঝুঁকি হ্রাস ও আশ্রয়কেন্দ্র উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সোমবার (১৩ জুলাই) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই আহ্বান জানায়।  

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় এক দশক ধরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। পাহাড় কেটে তৈরি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী ঘরগুলো বর্ষা মৌসুমে ভূমিধস, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, মিয়ানমার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত থাকায় ক্যাম্পগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং দাতা দেশগুলোর উচিত শিবিরের অতিরিক্ত ভিড় কমানো এবং বাঁধ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক, জরুরি স্থানান্তর কেন্দ্র ও পাহাড় সুরক্ষার জন্য অর্থায়ন পুনর্বহাল করা।

সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, প্রতি বর্ষাতেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। অর্থায়ন কমে যাওয়ায় শিবিরগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এমন নীতির ফল, যা শরণার্থীদের জীবনকে পূর্বানুমেয় ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটে। এতে ২৬ হাজার ১১৯ জন রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ সময় ৯৫টি ভূমিধসে চার হাজার ৩০৭ জন বাস্তুচ্যুত হন, দুই হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৩টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। এছাড়া শিক্ষা কেন্দ্র, টয়লেট, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, সড়ক, সিঁড়ি, সেতু ও প্রতিরোধ দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিলেও অনেকেই আশ্রয় হারানোর ভয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে রাজি হননি। এইচআরডব্লিউর সঙ্গে কথা বলা এক পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকৌশলী বলেন, শুরু থেকেই পাহাড় কেটে পরিকল্পনাহীনভাবে শিবির নির্মাণ করা হয়েছিল এবং পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে অর্থের অভাবে টেকসই ভূমিধস প্রতিরোধক অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না।

সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আসা এক রোহিঙ্গা জানান, নতুন আগতদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আশ্রয় বরাদ্দ না থাকায় তিনি পাহাড়ের কিনারায় নিজেই একটি ঘর তৈরি করেছিলেন। গত ৬ জুলাই সেই পাহাড় ধসে তার দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনির মৃত্যু হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর এ বছরের মে মাস পর্যন্ত অন্তত এক লাখ ৫২ হাজার নতুন রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে বিদ্যমান শিবির সম্প্রসারণের জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) অতিরিক্ত জমির আবেদন করলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

মানবিক সহায়তাকর্মীরা বলছেন, শিবিরে জায়গার অভাবে জরুরি স্থানান্তর কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়েছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে গোপনীয়তা, স্যানিটেশন ও মৌলিক সেবার ঘাটতি থাকায় অনেক শরণার্থী সেখানে যেতে অনিচ্ছুক।

এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার তুলনামূলক শক্তিশালী অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং ৫০ হাজার আশ্রয় পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে যায়।

সংস্থাটি বলেছে, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাকে স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দাতা দেশগুলোর উচিত নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণ, পাহাড় স্থিতিশীল করা, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

বর্তমানে আশ্রয় ও শিবির ব্যবস্থাপনা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ পাওয়া গেছে। এখনও প্রায় সাত কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় আরও দুই কোটি ৩২ লাখ ডলারের অর্থসংকট রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কেবল উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। পরবর্তী ভূমিধসের অপেক্ষায় না থেকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

/এসও/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
নেপালে বন্যায় নিহত ৯০০ ছাড়ালো, নিখোঁজ ৪৭০০
হাহাকারের ভেতরেই নতুন বন্যা আতঙ্ক: নেপালে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি
বন্যায় শিক্ষকের তৎপরতায় যেভাবে বাঁচলো ১ হাজার ৬৪৩ শিশু
সর্বশেষ খবর
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংঘর্ষে জড়ালেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা, নেপথ্যে কী
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংঘর্ষে জড়ালেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা, নেপথ্যে কী
শাহজালালে ৪৭৫ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ ২ জন আটক
শাহজালালে ৪৭৫ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ ২ জন আটক
নতুন পে-স্কেল হলো, এবার কি দুর্নীতি কমবে?
নতুন পে-স্কেল হলো, এবার কি দুর্নীতি কমবে?
একদিনে হামের উপসর্গে ৬, ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু
একদিনে হামের উপসর্গে ৬, ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত