ভূমিকম্পে ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ শুধু ভবনের উচ্চতা নয়; ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা এবং নির্মাণে অনিয়মও বড় কারণ। তাই ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষা ও প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন থাকায় একসঙ্গে সব ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে ধাপে ধাপে র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁকি নিরূপণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা করা হবে।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে শুধু রাজউককে দায়ী করলে হবে না। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ নয়
ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবন নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করার মতো কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না। নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণ করা ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়ারও সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ভবনের নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শুধু নকশায় স্বাক্ষর করলেই হবে না, নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের দায়িত্ব রয়েছে। অনিয়ম হলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা নিয়মের মধ্যে আসুন। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করুন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিন।
গণমাধ্যমকে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই করে রাজউক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে শক্তিশালী উপস্থিতিতে পরিণত করাই তার লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। শুরু করেছি, কতটুকু করতে পারব জানি না; তবে আমরা চেষ্টা করছি। ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ভবন মালিক, প্রকৌশলী ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্বল মাটিতে নির্মাণেও ঝুঁকি
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ ও টেকসই ভবন নির্মাণ সম্ভব।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেন, দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঢাকার প্রায় ছয় লাখ ভবনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শুধু ভূমিকম্পের সময় নয়, সারা বছরই এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।
উদ্ধার প্রস্তুতিতে জোর
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে সহযোগিতা করা সম্ভব। ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এ ধরনের আলোচনা আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি জিলানী মিলটন, সাংগঠনিক সম্পাদক আতিক হাসান শুভ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়শ্রী ভাদুড়ী, অর্থ সম্পাদক জাহিদ ইসলাম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি এবং সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদারসহ অন্যরা।