বাংলাদেশ ও জাপান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও সুসংহত ও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং জাপানের সিনিয়র উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী নামাজু হিরোইউকি নিজ নিজ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন
আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সবুজ জ্বালানি, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ), বিগ-বি উদ্যোগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু এবং জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
জাপানের সিনিয়র উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী নামাজু হিরোইউকি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) নিয়ে জাপানের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে জানান।
তিনি ইপিএ, বিগ-বি উদ্যোগ এবং অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স (ওএসএ) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে পাঁচটি টহল নৌকা হস্তান্তরের বিষয়টিকেও তিনি স্বাগত জানান।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর ও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতারও প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং টেকসই উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে জাপানে বাংলাদেশি নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পর্ক আরও জোরদারে এ ধরনের বিনিময় কর্মসূচি বাড়ানোর আহ্বান জানান পররাষ্ট্র সচিব।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ১১ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য মানবিক ও আর্থ-সামাজিক বোঝা বহন করছে। মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান বলে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখায় জাপানকে ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্র সচিব।
উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করে। জাতিসংঘের সনদের নীতিগুলো সমুন্নত রাখা এবং বহুপক্ষীয় মঞ্চে সহযোগিতা জোরদারে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তারা। অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে নিবিড় সমন্বয় ও পারস্পরিক সমর্থন বজায় রাখার প্রস্তুতির কথাও জানান দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি হিসেবে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ-জাপান ফরেন অফিস কনসালটেশনের পরবর্তী বৈঠক আগামী বছর টোকিওতে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।