মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে ২০ মিনিটের মধ্যে জরুরি সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য নামানো হচ্ছে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট (বিএলএস) অ্যাম্বুলেন্স। থাকবে কল সেন্টার, প্রশিক্ষিত জনবল ও দুর্ঘটনাস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা। লক্ষ্য দুর্ঘটনার পর প্রাণহানি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ কাজে লাগানো।
তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করছে, এটি কতটা সমন্বয় করে কার্যকর করা যাচ্ছে, তার ওপর।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা নোবেল দে জানিয়েছেন, অ্যাম্বুলেন্স উদ্বোধন ও প্রকল্পের কার্যক্রম অবহিতকরণ অনুষ্ঠান আগামীকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সড়ক ভবনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের (বিআরএসপি) অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংকের মূল অর্থায়ন ছিল ৩৫৮ মিলিয়ন ডলার। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য গাজীপুর-এলেঙ্গা (এন-ফোর) এবং নাটোর-নবাবগঞ্জ (এন-সিক্স) মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানো।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট (বিএলএস) অ্যাম্বুলেন্স ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছে। এন-ফোর ও এন-সিক্স মহাসড়কে জরুরি সেবার সাড়া দেওয়ার সময় বর্তমানে ৩০ মিনিট ধরে হিসাব করা হয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য সেটি ২০ মিনিটে নামিয়ে আনা। অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু হলে টোল-ফ্রি নম্বর চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) মুনতাসিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে পারলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়ে। সে বিবেচনায় সরকারের আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সভিত্তিক জরুরি চিকিৎসাসেবার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিশ্বজুড়েই এখন দুর্ঘটনা-পরবর্তী মৃত্যু কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স’ বা দুর্ঘটনা-পরবর্তী সমন্বিত জরুরি সেবা গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিআরএসপির আওতায় সে ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, “সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নেওয়া গেলে তার জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়ে।”
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া, ঘটনাস্থল নিরাপদ করা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, আহতদের উদ্ধার এবং অ্যাম্বুলেন্সকে দ্রুত বের করে দেওয়ার কাজে হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা সবার আগে। ফলে নতুন এই জরুরি সেবা কার্যকর করতে পুলিশ, কল সেন্টার, অ্যাম্বুলেন্স, প্যারামেডিক ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর যদি এসব সংস্থা একই ব্যবস্থার মধ্যে দ্রুত কাজ করতে পারে, তাহলে ২০ মিনিটের লক্ষ্য অর্থবহ হবে। তবে যে সংস্থাকে দুর্ঘটনাস্থলে প্রথম কাজ করতে হয়, সেই হাইওয়ে পুলিশই যদি পরিকল্পনার বাইরে থাকে, তাহলে অ্যাম্বুলেন্সের দ্রুত সাড়া দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও প্রকল্পটিকে একটি ‘মাল্টি-এজেন্সি’ বা বহু সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, বিআরটিএ, বাংলাদেশ পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর—চারটি সংস্থা এতে যুক্ত। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসাসেবা উন্নত করা।
প্রকল্পের আওতায় শুধু অ্যাম্বুলেন্স কেনা নয়, তা পরিচালনা, কল সেন্টার এবং দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক সেবায় যুক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ কাজের জন্য গত ১২ মার্চ এমপাওয়ার-আদ-দিন-বন্ডস্টাইন জেভির সঙ্গে প্রায় ৭৮ কোটি টাকার চুক্তি করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
শুধু অ্যাম্বুলেন্স নয়, পথে চিকিৎসাও জরুরি
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামানের মতে, অ্যাম্বুলেন্স কেনা পুরো সমাধান নয়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত একটি কার্যকর চিকিৎসা-শৃঙ্খল তৈরি করতে হবে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা বা গোল্ডেন আওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ট্রমা সেন্টার বা হাসপাতালে নেওয়া গেলে তার জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়ে। সে বিবেচনায় আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সভিত্তিক জরুরি চিকিৎসাসেবা একটি কার্যকর মডেল।’
হাদিউজ্জামান আরও বলেন, আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স শুধু রোগী বহনের গাড়ি নয়। সেখানে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও টেলিমেডিসিন সুবিধা থাকতে পারে। এতে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে পথেই চিকিৎসার নির্দেশনা নেওয়া যায়।
যানজটেই আটকে যেতে পারে ‘গোল্ডেন আওয়ার’
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে সড়কের যানজট। হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমাদের প্রধান সমস্যা দুর্বল সড়ক নেটওয়ার্ক ও যানজট। দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো যেমন কঠিন, তেমনি আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।’
তার মতে, উন্নত দেশে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রুট অপটিমাইজেশন এবং ট্রাফিক সিগন্যালে অগ্রাধিকার থাকে। কোনও অ্যাম্বুলেন্স মোড় বা সিগন্যালে পৌঁছালে অন্য যান থামিয়ে সেটিকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি।
হাদিউজ্জামান আরও বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স মডেল চালু করলেই হবে না। সড়ক নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং ইন্টারসেকশনে অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার—সব একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।’
প্রকল্পের অর্থায়নের পুনর্বিন্যাস
প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অর্থায়নের পুনর্বিন্যাস। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবায়নে ধীরগতি ও কম অর্থ ছাড়ের পর প্রকল্প পুনর্গঠন করা হয়। মূল ঋণ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বাতিল করা হয়। পুনর্গঠনে দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবার জন্য বরাদ্দও আগের তুলনায় ৫৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে এন-ফোর ও এন-সিক্সের পাইলট করিডরে জরুরি চিকিৎসা ও পোস্ট-ক্র্যাশ কেয়ারের মূল কার্যক্রম বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ৬০টি অ্যাম্বুলেন্স নামানোই মুখ্য নয়। ফোন পাওয়ার পর কত দ্রুত গাড়ি ছাড়বে, কত মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে, সেখানে কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে এবং আহত ব্যক্তিকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হবে—এসবের ওপর নির্ভর করবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা।
‘সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়’
নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চনও সম্প্রতি সড়ক নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গত ৭ আগস্ট সংগঠনটির এক সমাবেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়েছে। বাংলাদেশেও তা সম্ভব।
তার ভাষায়, নিরাপদ সড়ক কোনও একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রকৌশলী, পরিবহন খাত এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।