হিমালয়ের কোলে যে দেশটাকে আমরা শান্ত ও স্নিগ্ধ বলে জানি, সেই নেপাল আজ শোকে স্তব্ধ। মাত্র এক সপ্তাহ আগে, গত ২৬ আগস্ট সকালে চীন সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এরপর ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনও প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯টি দেশের ৫৯০ জন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
নেপাল রেডক্রসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেখানে কাজ করছেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের কমিউনিকেশন কো-অর্ডিনেটর সামিউল ইসলাম শোভন। তার চোখে, একসময় সবুজে ঘেরা অপূর্ব নেপাল এখন ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে।
নেপালের আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা। সেখানকার গ্রামের পর গ্রাম যেন মানচিত্র থেকেই মুছে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি ও হেলিকপ্টার নিয়ে পৌঁছালেও তাদের সামনে এখন কেবল কাদা আর ধ্বংসস্তূপ।
রাসুয়ার এক নারীর কথা যেন পুরো দেশের পরিস্থিতিই তুলে ধরে। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের হাতে কিছু নিয়ে পালানোর সময়টুকুও ছিল না। আমরা যা পরে ছিলাম, সেটাই আমাদের শেষ সম্বল। তাও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় প্রায় ৪৩ হাজার নারী ও কিশোরীর জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। যারা বেঁচে আছেন, তাদের খাবার ফুরিয়ে আসছে, নেই নিরাপদ পানির নিশ্চয়তাও। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে, আরও দুটিতে পৌঁছানোই যাচ্ছে না।
মৃত্যু হাজার ছাড়িয়েছে
গত তিনদিন ধরে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কাজ করছেন সামিউল ইসলাম শোভন। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, উদ্ধারকাজ এখনও পুরোদমে চলছে। বিশেষ করে রাসুয়া এলাকায় প্রতিদিনই লাশ পাওয়া যাচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমি যেদিন প্রথম আসি, ৩০ আগস্ট, সেদিন সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৭০। গতকাল পর্যন্ত সেটা হাজার ছাড়িয়েছে।’
নুয়াকোটের দেবীঘাট এলাকার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সামিউল বলেন, পুরো এলাকাটিই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে দুই থেকে চারতলা ভবনগুলোও কাদা-বালিতে একতলা বা দুইতলা পর্যন্ত ডুবে গেছে। মাটি এতটাই নরম হয়ে আছে যে, হাঁটার সময় পা বসে যাচ্ছে। তার ভাষায়, পুরো এলাকা যেন বড় একটি চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি ইন্টারনেটে দেখছিলাম, জায়গাটা আগে কেমন ছিল। পুরোপুরি সবুজ, কত সুন্দর, কত রঙিন। এখন আপনি যেদিকে তাকাবেন, সবদিকে শুধু ধূসর। মনে হচ্ছে, প্রকৃতির ওপর যেন সিমেন্ট ঢেলে দেওয়া হয়েছে।’
যা ছিল, সব হারিয়েছে মানুষ
সামিউলের ভাষ্য, দুর্গত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কথা বলতে গেলেই অনেকে কেঁদে ফেলছেন। অনেকেই যেন বাকরুদ্ধ, পুরোপুরি শূন্য হয়ে আছেন।
তিনি বলেন, ‘দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল, এক লোক চারতলা ভবন থেকে কাদা-মাটি ফেলছেন। আমি জানতে চাইলাম, এত উপরে কাদা উঠেছে? তিনি বললেন, পুরো ঘরবাড়ি বালির নিচে চলে গেছে। আমাদের যা কিছু ছিল, সব শেষ।’
একটি গলির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সামিউল বলেন, ‘গলির দুই পাশে আগে ঘরবাড়ি ছিল। এখন মনে হচ্ছে, এখানে যেন বোমা মারা হয়েছে। প্রত্যেকটি বাড়ির কোনও না কোনও অংশ ভেঙে গেছে। দেখে মনে হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনও এলাকা।’
তার ভাষ্য, রাস্তার অনেক অংশই আর চেনার উপায় নেই। নেপালের সেনাবাহিনী সেখানে গিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছে। একটি কটেজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটিও পুরোপুরি কাদা ও মাটির নিচে মিশে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন নদীর ধারে দাঁড়াচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমরা আসলে দেড় থেকে দুইতলা উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ আমাদের পায়ের নিচে আরও দেড় থেকে দুইতলা ভবন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। সামগ্রিকভাবে কোনো স্থাপনাই আর ঠিক নেই।’
আরও সামনে গিয়ে পুরো বাণিজ্যিক এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। সেখানে ব্যাংক, এটিএম বুথ, অফিসসহ নানা স্থাপনা ছিল। পাহাড়ের দিকে ছিল আবাসিক এলাকা। নদীর ধার ধরে ছিল বাণিজ্যিক স্থাপনা। এখন সবই কাদার নিচে।
সামিউল বলেন, ‘মানুষ এখনো তাদের ভবন থেকে বেঁচে যাওয়া জিনিসপত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কেউ পরিবারের সদস্যদের খুঁজছেন। কেউ কেউ হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কেউ এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট—তাদের যা ছিল, প্রায় সবই শেষ। এক লাইনে বলা যায়, তারা আজ নিঃস্ব।’
রাসুয়ায় ত্রাণ পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সামিউলের মতে, সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া। চীন সীমান্তের কাছে দুর্যোগের মূল উৎসের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘কাঠমান্ডু থেকে রাসুয়া যেতে এখন মোটামুটি আট থেকে ১০ ঘণ্টা লাগছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে যে পথ, সেটা ১০ মিনিটের মতো। এখন ঘুরে যেতে হচ্ছে বলে আরও পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় লাগছে। ঝুঁকি বেশি থাকায় রসুয়াতে অনেক জায়গায় যেতে দিচ্ছে না সেনাবাহিনী। তাই হেলিকপ্টারই যাতায়াতের ভরসা।’
ফলে দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও দড়ির সাহায্যে বড় ঝুড়িতে করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ওপরে পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ওই এলাকায় এখন বর্ষাকাল। তার মধ্যে ভূমিধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। রাসুয়া যাওয়ার পথ আবার এক লেনের। ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন।
শেষ আশ্রয় হোল্ডিং সেন্টারে
সামিউল জানান, দুর্গত এলাকায় পানির স্রোতও স্বাভাবিক নয়। স্থানীয়রা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পানির প্রবাহ রয়েছে।
আইএফআরসির গ্লোবাল ইমার্জেন্সি রেসপন্সের অংশ হিসেবে সাত দিনের জন্য নেপালে মোতায়েন হয়েছেন সামিউল। সেখানে কমিউনিকেশন, কনটেন্ট ও মিডিয়া নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
সামিউল বলেন, ‘নেপাল রেডক্রস সোসাইটি প্রথম দিন থেকেই মাঠে আছে। মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা, মানুষকে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়া, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ, চিকিৎসা সহায়তা, জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং নারীদের প্রয়োজনীয় ডিগনিটি কিট দেওয়ার কাজ করা হচ্ছে।’
দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন জরুরি হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে। সেখানে ছোট শিশুরাও রয়েছে, যাদের কেউ বাবা-মাকে খুঁজে পাচ্ছে না, আবার কারও ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ এখন ঘরে থাকার অবস্থায় নেই। তাই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। নেপাল রেডক্রসের হোল্ডিং সেন্টারেও অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।’
সামিউল জানান, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা ত্রাণের অভাব নয়, বরং ত্রাণ দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, ‘মানুষকে দেওয়ার মতো সহায়তার কোনও অভাব নেই। কিন্তু মানুষের কাছে সেই সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিস্থিতিই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।’
রাসুয়ায় যাওয়ার সংযোগকারী একটি সেতু ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে গেছে। ফলে বহু পথ ঘুরে দুর্গত এলাকায় যেতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক হেলিকপ্টার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে কাজ করছে।
সামিউলের ভাষায়, ‘পুরো রাস্তাটাকে আমাদের ভাষায় বললে, এক ধরনের “রিলিফ টুরিজমের” মতো অবস্থা হয়ে গেছে।’
বেঁচে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
সামিউল জানান, আইএফআরসি ও নেপাল রেডক্রসের দলগুলো বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও দুর্গত এলাকায় গিয়ে মানুষের প্রয়োজন নিরূপণ করছে। কোথায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই ধরনের দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রথম এক সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এরই মধ্যে প্রয়োজন নিরূপণ করে কাজ করছি। প্রতিনিয়ত সহায়তা আসছে। এখন আমাদের ব্যস্ততম সময় যাচ্ছে।’
নেপালের সেনাবাহিনীও উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে দুর্গত এলাকার ব্যাপকতা ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সময় লাগছে
সামিউল জানান, এখন নেপাল সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে জীবিতদের খুঁজে বের করা।
তিনি বলেন, ‘যারা বেঁচে আছেন কিন্তু এখনো নিখোঁজ, তাদের খুঁজে বের করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মৃতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে। তবে অগ্রাধিকার হচ্ছে—যারা বেঁচে আছেন, তাদের দ্রুত উদ্ধার করা।’