জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি কিলোমিটারে বাসের ভাড়া ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ। সিদ্ধান্ত হলেও এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা শোনা যায়নি। অথচ এর প্রভাব এরইমধ্যে রাজপথে দৃশ্যমান। দূরপাল্লার বাসযাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন ট্রাক-পিকআপের মালিকরা।
গত রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। সড়ক পরিবহনের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। আর পেট্রোলের দাম এখন লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপর। এর ফলে মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপের মধ্যেই থাকা অর্থনীতিতে মানুষের ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়বে।
সকাল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে সরেজমিনে দেখা যায়, দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে গন্তব্যভেদে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এসি ও নন-এসি; দুই ধরনের বাসেই বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল।
কুষ্টিয়ার যাত্রী মো. রমজান জানান, আগের দিন ঢাকায় আসতে তিনি ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন একই যাত্রার জন্য তাকে আরও ১০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক চাপ এসে পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ বলেন, সাময়িকভাবে ভাড়া না বাড়ালে পরিবহন মালিকদের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে। শিগগিরই সংশোধিত ভাড়ার তালিকা ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কমিটি দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করে। পরে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নতুন বাসভাড়া নির্ধারণ নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে বৈঠক হয়।
বৈঠকের পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, কমিটির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আজকে বাস ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একমত হয়েছে সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ।
পরিবহন মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, ৪৫ আসনের একটি দূরপাল্লার বাস সাধারণত এক লিটার ডিজেলে প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথ চলতে পারে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থাকলে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ হতো ৩২ দশমিক ৮৬ টাকা। এখন ১৩৫ টাকা হওয়ায় সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৫৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ৫ দশমিক ৭১ টাকা। ১০০ কিলোমিটারে এই বাড়তি ব্যয় প্রায় ৫৭১ টাকা।
দীর্ঘ পথের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব প্রায় ৪৩৮ কিলোমিটার। যাওয়া-আসার একটি যাত্রায় ২৫০ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন হয়। ২৫০ লিটার হিসাব করলেও প্রতি রাউন্ড ট্রিপে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার টাকা।
গড়ে ৫০ জন যাত্রী বহনকারী একটি বাসে এই অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের চাপ যাত্রীপ্রতি প্রায় ১০০ টাকার সমান। আর একটি বাস মাসে ২৫ দিন চললে শুধু ডিজেল বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
বাসমালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, প্রতি ১০০ কিলোমিটারে অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা জ্বালানি ব্যয় হওয়ায় পরিবহন মালিকদের সামনে ভাড়া সমন্বয় করা ছাড়া তেমন কোনো পথ খোলা থাকছে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, পরিবহন মালিকরা এরই মধ্যে লোকসানে ছিলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাড়া সমন্বয়ের আহ্বান জানান তিনি।
পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক পণ্য আনতে ভাড়া ৩২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়েছে বলে জানান গুদাম ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম।
কোনো কোনো রুটে ট্রাকভাড়া বেড়েছে ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ২৬৫ বস্তা চাল পরিবহনের খরচ ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বেনাপোল থেকে কাঞ্চপুরে ১০ দশমিক ৫ টন পোশাক বহনকারী কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া এখন ২২ হাজার টাকা। আগে এই ভাড়া ছিল ১৮ হাজার থেকে ১৯ হাজার টাকা।
ট্রাকচালক মোহাম্মদ নাজমুস জামান বলেন, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া-আসার একটি ট্রিপে প্রায় ২৩০ লিটার ডিজেল লাগে। ফলে তার জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টাকা বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহনের বাড়তি ব্যয় অনির্দিষ্টকাল নিজেদের কাঁধে বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বাড়তি পণ্য পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেচ ও কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ। দেশের মোট ডিজেল চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যবহার হয় কৃষি ও সেচ খাতে।
ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচের ব্যয়ও বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত জেনারেটর ও যন্ত্রপাতি পরিচালনার খরচও বেড়ে যাবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে পরিবহন, খাদ্য ও রান্নার ব্যয় বাড়লে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
তার মতে, শহরের নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি এক্সপোসড গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে থাকবেন।
সেলিম রায়হান আরও বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানো সরকারের আর্থিক হিসাবকে কিছুটা সহজ করতে পারে। তবে এর বিস্তৃত প্রভাব হিসেবে উচ্চতর মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বৈষম্য আরও বাড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় সরকারের সামনে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে এক লিটার ডিজেল আমদানি করতে সরকারের প্রায় ২০৫ টাকা খরচ হচ্ছে। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
তবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নভেম্বরের ফিউচার ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমেছে, যা ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল ১০৯ ডলার। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর জ্বালানি খাতে করব্যবস্থা এবং বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যে ২৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর ও শুল্ক আদায় করে। বর্তমানে আমদানি করা ডিজেল থেকে শুল্ক ও কর বাবদ সরকারের রাজস্ব দাঁড়ায় লিটারপ্রতি প্রায় ৩৮ টাকা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায় অপচয় এবং সিস্টেম লস কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বা লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপর পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছিল।
মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে থাকা অবস্থায় সর্বশেষ জ্বালানি মূল্য সমন্বয় অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ব্যয়ের নতুন বোঝা তৈরি করতে পারে; বাস ও ট্রাক থেকে শুরু করে সেচ, কারখানা এবং খাদ্যবাজার পর্যন্ত। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সরকার নিরুপায়। তবে এটাও ঠিক যে এর সবচেয়ে বড় ভোগান্তির শিকার হবেন সাধারণ মানুষ। শুধু খাদ্য নয়, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।’
তিনি বলেন, সরকার পে স্কেল ঘোষণা করেছে, সেখানে সরকারকে বাড়তি ৩৭ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই সরকারকে বাড়তি খরচের দিকে যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার একটি কাজই করতে পারে; পরিবহনে ভাড়া বাড়ার ক্ষেত্রে যাতে ন্যায্য পরিমাণে বাড়ে, তা নিশ্চিত করা। সব সময় দেখা যায়, তেলের দাম বাড়ার পর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। সেটি বন্ধ করা জরুরি।