আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং জনগণের আস্থা অর্জনে গণমাধ্যমকে প্রচলিত জাতীয়তাবাদী বয়ানের বাইরে এসে সহযোগিতামূলক ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার চর্চা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ।
রবিবার (৮ নভেম্বর) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে আয়োজিত এক মিডিয়া ফোরামে তিনি এ কথা বলেন। ‘ক্রেডিবিলিটি, ট্রাস্ট অ্যান্ড মিডিয়া রেসপনসিবিলিটি ইন বিল্ডিং আ রিজিওনাল কমিউনিটি উইথ আ শেয়ার্ড ফিউচার’ শীর্ষক এই ফোরামটি চার দিনব্যাপী চতুর্থ ট্রান্স-হিমালয়ান কমিউনিকেশন অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়।
রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘গণমাধ্যমের ভূমিকা কেবল একটি দেশের নজরদারির দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি, অভিন্ন সমস্যাগুলো তুলে ধরা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতেও গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি আঞ্চলিক সম্প্রদায় গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, জনগণের আস্থা এবং সীমান্তপারের দায়িত্বশীলতাভিত্তিক গণমাধ্যমব্যবস্থা প্রয়োজন।’
আঞ্চলিক সাংবাদিকতার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান
আঞ্চলিক সাংবাদিকতার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন কেবল সংকট, দুর্যোগ কিংবা দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক অভিবাসনের মতো অভিন্ন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাণিজ্য, আন্তসীমান্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে ডেটা জার্নালিজমের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের সাংবাদিকতা আঞ্চলিক সংবাদ পরিবেশনায় অতিরঞ্জন ও রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব কমাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক নীতির প্রভাব সরাসরি যেসব প্রান্তিক ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে, সংবাদমাধ্যমে তাদের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে নয়, বরং সংবাদ বয়ানের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে তাদের তুলে ধরতে হবে।
উন্নয়নশীল অঞ্চলের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে রিয়াজ আহমেদ বলেন, গণমাধ্যম মালিকদের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা অনেক সময় সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
সাংবাদিকদের বেতন নিয়ে শোষণ এবং আইনি সুরক্ষার অভাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব সমস্যা সাংবাদিকদের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়ায় এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করে।
তিনি বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনা প্রভাবিত করা এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সীমিত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য ও উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ানের দ্রুত বিস্তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
রবিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী সম্মেলনটির উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
উদ্বোধনী অধিবেশনে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও জ্ঞান বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, জ্ঞান তৈরি ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এবং সেই জ্ঞান জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের পরিপূরক দায়িত্ব রয়েছে।
তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়ানো, গবেষণা এবং তথ্যনির্ভর নীতিনির্ধারণ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়ন ও ওপেন ডেটা পলিসি প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দীর্ঘমেয়াদি যৌথ গবেষণা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং তথ্য ও একাডেমিক সম্পদ বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনস্বাস্থ্যের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, লোকপ্রশাসন বিভাগ ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ; চীনের ইউনিভার্সিটি অব ইলেকট্রনিক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির স্কুল অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, চীনের কাঙবা টিভি এবং নেপালের হিমালয়া টেলিভিশন যৌথভাবে সম্মেলনটির আয়োজন করেছে।