সাক্ষাৎকার

‘সমতলের আদিবাসীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোনও কাঠামো নেই’

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ সমতলে বসবাস করলেও তাদের অধিকার, ভূমি সমস্যা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য মন্ত্রণালয়, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড ও ভূমি কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকলেও সমতলের আদিবাসীদের জন্য তেমন কোনো কাঠামো নেই। ফলে ভূমি অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে তারা পিছিয়ে রয়েছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। সমতলের আদিবাসীদের অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। 

প্রশ্ন: সমতল আদিবাসীদের মধ্যে নিজেদের অধিকার নিয়ে বোঝাপড়া কেমন?

সঞ্জীব দ্রং: প্রথমেই যেটা বলবো, সমতলের আদিবাসীদের বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জানাশোনা বা যোগাযোগ আগে অনেক কম ছিল। আদিবাসী বা পাহাড়ি বলতেই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে মনে করা হতো পার্বত্য চট্টগ্রামকে। এর কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই যুগের বেশি সময় ধরে অধিকার আদায়ের সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল। এরপর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তি চুক্তি হয়। এটা সবাই জানে। এ কারণে মানুষ আদিবাসী বলতেই, এখনও বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘ বা বাংলাদেশে যারা কাজ করে, তারা মনে করে আদিবাসী মানে পার্বত্য চট্টগ্রাম। কিন্তু আসলে তা নয়।

সরকার ২০১৯ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী একটি গেজেট করেছে। সেখানে ৫০টি জনগোষ্ঠীর তালিকা আছে। এর মধ্যে ৩৮টি হলো সমতলের, অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে। আমাদের হিসাবে বাংলাদেশে মোট ৩০ লাখ আদিবাসী আছে। এই ৩০ লাখের মধ্যে প্রায় ২০ লাখই সমতলে, অর্থাৎ গারো, সাঁওতালরা। তার মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী বাংলাদেশের সমতলেই বাস করে। কিন্তু সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং সংগ্রামের ফলে রাষ্ট্রীয় কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থা নেই বলেই সমতলের বিষয়ে আলোচনাটা কম।

যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি মন্ত্রণালয় আছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়। তিনটি জেলা মিলে তিনটি জেলা পরিষদ আছে। আবার তিনটি জেলার জন্য একটি উন্নয়ন বোর্ড আছে। একটি টাস্কফোর্স আছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আছে। এ ধরনের কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। সমতলের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছুই নেই। কিছু বরাদ্দ থাকে মন্ত্রণালয়ে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, এই। এসব কারণে সমতলের আদিবাসীদের সম্পর্কে জানাজানি কম।

গত আড়াই দশক ধরে আমরা সবাইকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। আদিবাসী ফোরাম গঠিত হয় ২০০১ সালে। আদিবাসী ফোরাম হওয়ার পর মূলত সমতলের আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার, তাদের ভূমির অধিকার, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু নীতিমালা যেন হয়, সমতলের আদিবাসীদের জন্য যেন আলাদা মন্ত্রণালয় হয়, পৃথক মন্ত্রণালয়, এসব দাবি নিয়ে কাজ করছি।

সমতলের আদিবাসীদেরও ভূমি সমস্যা আছে। মধুপুরের বন, সুন্দরবন, খাসিয়াদের পাহাড় বা বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে তাদের সমস্যা আছে। বর্তমান বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রীয় ভূমি আইন, এই আইন দিয়েও সমতলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষা করা যাচ্ছে না।

সেজন্য সমতলের আদিবাসীদের জন্যও যেন একটি পৃথক ভূমি কমিশন হয়, এই দাবি দীর্ঘদিনের। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নামে উত্তরবঙ্গে একটি সংগঠন আছে। তারা তো এই দাবি তুলেছিল ৯০-এর দশকে। গত দুই-তিন দশক ধরে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছি। সমতলেও নিজেদের নিজস্ব আঞ্চলিক সংগঠন আছে। যেমন সিলেটে আদিবাসীদের সংগঠন আছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহে আদিবাসীদের সংগঠন আছে, উত্তরবঙ্গে আছে।

প্রশ্ন: আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার নেই বলা হয়। এই সাংবিধানিক অধিকার কেন প্রয়োজন?

সঞ্জীব দ্রং: আমাদের যে সংবিধান, সেখানে নাগরিকদের জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর কথা ছিল। যেমন মৌলিক অধিকার অংশে ছিল, এখনও আছে, ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান অধিকার ভোগ করবে। তার মানে গারো, হাজং, সাঁওতাল, কোচ, বানাই, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সবাই তো নাগরিক, তাই সমান অধিকার ভোগ করবে।

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, ঐতিহাসিক কারণে সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও আসলে তারা এই অধিকার পায় না। শুধু আদিবাসীদের ক্ষেত্রে নয়, প্রান্তিক মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, গরিব মানুষ, কৃষকও সমান অধিকার পায় না। নারী ও শিশুও অধিকার পায় না। এজন্য নারীদের জন্য একটি বিশেষ অধিকার, নারী উন্নয়ন নীতি আছে। শিশুদের জন্যও আছে। আদিবাসীদেরও সংবিধানে যেহেতু কোনো উল্লেখ ছিল না, আবার বলবো, নাগরিক হিসেবে তো সবার জন্য আছে। কিন্তু সবার জন্য থাকলেও এটা সুনির্দিষ্ট করে না দিলে অধিকার তারা ভোগ করতে পারে না। এটা পৃথিবীর অনেক দেশে আছে। সেজন্য আমরা চেয়েছি, সংবিধানে অন্তত যেন তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, ভূমি অধিকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো লেখা থাকে। এটা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ২০১১ সালে সংবিধানে ২৩-এর ‘ক’ ধারা যুক্ত করা হয়। আপনি সংবিধানে দেখবেন ২৩-এর ‘ক’। সেখানে বলা হয়েছে, ‘তবে আদিবাসী’ শব্দ তারা বলেনি, কিন্তু এটা বোঝা যায় যে তাদেরই বলা হয়েছে। তারা বলেছে, ‘রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’

সেখানে বলছে, এই যে আদিবাসীদের শব্দ, যদিও উপজাতি এবং নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যের সংস্কৃতি বিকাশ, আঞ্চলিক সংস্কৃতি বিকাশ এবং উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করিবেন। কিন্তু আমরা চাচ্ছি আদিবাসীদের আত্মপরিচয় ও অধিকার। তাদের ভাষা আছে, বাংলার বাইরেও মাতৃভাষা আছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, জীবনধারা আছে। তাদের ভূমির অধিকার ও ভূমি মালিকানার সংস্কৃতি ভিন্ন। আমরা অনেক সময় বলি, ভূমির ওপর আমাদের যৌথ মালিকানা আছে, কালেক্টিভ রাইটস আছে। কিন্তু কালেক্টিভ রাইটস সংবিধানে স্বীকৃত নয়।

এই বিষয়গুলোর স্বীকৃতি আমরা চেয়েছি। স্বীকৃতি পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আছে। সংবিধানে স্বীকৃতি থাকলে আপনি সংবিধানকে ধরে আইন প্রণয়ন করতে পারবেন, জাতীয় একটি আদিবাসী নীতি করতে পারবেন। তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

বর্তমান যে সংবিধান আছে, এখানেও কিন্তু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে, ইচ্ছা করলে। সেটা হলো ২৮ ধারায় আছে, সমাজের অনগ্রসর অংশের জন্য রাষ্ট্রকে যেকোনো বিধান প্রণয়ন থেকে এই সংবিধান নিবৃত্ত করবে না। যেমন নারীদের জন্য ৫০টি আসন আছে। এটা কীভাবে করে? এটাকে বলে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, ওই যে ২৮ ধারায়। আমাদের সংবিধানেও কিন্তু না থাকলেও করতে পারতো, কিন্তু করে কি? করে না।

আমরা চাই, এজন্য সংবিধানে একটি অন্তর্ভুক্তি থাকবে। সংবিধান বলে দেবে, একটা দিকনির্দেশনা দিয়ে দেবে যে, তুমি বাংলাদেশে বাঙালি জাতির বাইরেও আদিবাসীরা আছে, বিভিন্ন জাতির মানুষেরা আছে, তাদের জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করো।

সংবিধানে স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা দিলে আমাদের রাষ্ট্রের সরকারের ভালো হবে। আমরা বলতে পারব, দেখো বাংলাদেশে আদিবাসীদের স্বীকৃতি আছে। কারণ আদিবাসী মানেই তো বঞ্চিত মানুষ। আদিবাসী মানুষ মানেই ভূমি হারানো মানুষ। আপনি তাকালে দেখবেন, আদিবাসী মানুষ মানেই গরিবের চেয়েও গরিব। বাঙালিও গরিব আছে, কিন্তু আদিবাসী হলে সে আরও নানা কারণে আরও কিছু বৈষম্যের শিকার হয়। এজন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

জাতিসংঘ বলছে, ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’, কাউকে পিছনে ফেলে নয়। ২০১৫ সালে এই কথা বলা হয়েছে। ১০-১১ বছর হয়ে গেছে। আধুনিক পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেলেও যাদের আমরা ইন্ডিজেনাস পিপলস বলছি, তারা আসলে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারেনি। এটা ধনী দেশেও হয়েছে। উত্তর আমেরিকাতেও হয়েছে। যাদের নেটিভ আমেরিকান বলা হয়, আমরা ছোটকালে পড়েছি ‘রেড ইন্ডিয়ান’। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ান ভুল শব্দ, এটা হবে নেটিভ আমেরিকান। কানাডাতে তাদের বলা হয় ফার্স্ট নেশনস। অস্ট্রেলিয়াতে তারা বলে অ্যাবোরিজিনালস, মানে আদি মানুষ, আদি বাসিন্দা, আদিবাসী। তাদের জন্য রাষ্ট্র কিছু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, স্পেশাল মেজারস। এটা আমরা বাংলাদেশে চাই।

প্রশ্ন: এই অধিকার পাওয়ার পথ কী?

সঞ্জীব দ্রং: বাংলাদেশে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, আমি স্বীকার করব। সেটা হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় আদিবাসী না বললেও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী বলে একটি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটা বোঝা গেছে, কাদের বলা হচ্ছে। এটা বোঝা গেছে যে ২৩-এর ‘ক’ ধারা আসলে গারো, সাঁওতাল, চাকমা, এটা বোঝা গেছে, এটা পরিষ্কার।

এই অধিকার পাওয়ার পথ আছে, তবে তা অবশ্যই কঠিন। এই কঠিন কাজটা করার জন্য আমি মনে করি, আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এটাকে আমরা বলি ‘হাই লেভেল ডায়লগ’। এটা পৃথিবীর অনেক দেশে হয়। আদিবাসী প্রতিনিধিদের বেছে বেছে ধরেন, উত্তরবঙ্গ থেকে দুইজন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে দুইজন, বৃহত্তর সিলেট থেকে দুইজন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আপনি পাঁচজন নেন, সমস্যা নেই। আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের কথা বলা, আলাপ-আলোচনা। মানে সরকার, রাষ্ট্র আমন্ত্রণ জানাবে।

এই সরকারের সঙ্গে আমরা ১৬ জুলাই সমতলের আদিবাসীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক ঘণ্টার বেশি সময় কথা বলেছি। আমরা সেখানে তাঁর কাছে দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছি। আমাদের শিক্ষার জন্য বাজেট বাড়ান, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ান, আমাদের প্রতিনিধিদেরও আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেন, একটি ভূমি কমিশন করে দেন, সংস্কৃতি বিকাশের জন্য বাজেট বাড়িয়ে দেন, আমরা বলেছি।

তিনি কিন্তু কোনোটাই ‘না’ করেননি। তিনি বলেছেন, যেগুলো পূরণ করা একটু সহজ, সেগুলো আমরা ধাপে ধাপে করব, আর যেগুলো কঠিন, সেগুলোও আমরা ধাপে ধাপে করব। এই রকম একটি উচ্চপর্যায়ের সংলাপ ঘন ঘন করা হলে সংলাপের মধ্য দিয়ে, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে আদিবাসী মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এবং সরকারের ব্যবধান কমানো যায়।

পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে ‘ক্লোজিং দ্য গ্যাপ’ বলে একটি প্রকল্প আছে। অস্ট্রেলিয়াতে আছে। আমাকে তারা নিয়ে গিয়েছিল ২০১৩ সালে। আমি অবশ্য তাদের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালেও গিয়েছি। ক্লোজিং দ্য গ্যাপ মানে এই ব্যবধান কমানো। যেমন খাসিয়া ছাত্র-ছাত্রী যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কোটায় বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভালো না এটা? ভালো।

এখন দেখেন, সরকারের বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়, ধরেন সচিবালয়ে কয়জন আদিবাসী আছে আপনি দেখেন? খুব কম, গোনা যাবে। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে হয়তো একজনও নেই, কোনো আদিবাসী নেই। কিন্তু তারা ভালো করে।

রাষ্ট্র যদি সুযোগ দেয়, দুয়ার খুলে দেয়, তাহলে তারা পারে। ফুটবলে নারীদের ক্ষেত্রে সবাই চেনে মারিয়া মান্দাকে। জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিল, ভালো করেছে। ঋতুপর্ণা চাকমা, সবাই চেনে। কোহাতি কিসকু ভালো খেলেছে অস্ট্রেলিয়াতে। কিসকু মানে সাঁওতাল। শিউলি আজিম একজন আছেন গারো। রাষ্ট্র সুযোগ দিলে তারা পারে। এই ব্যবস্থাগুলো রাষ্ট্রকে করে দিতে হয়, করে দিতে হবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন: আদিবাসীরা যারা আছেন, তারা এই অধিকার পাওয়ার পথ সম্পর্কে জানেন কি না?

সঞ্জীব দ্রং: আদিবাসীদের মধ্যে, বিশেষ করে আদিবাসী তরুণ ও নারীদের মধ্যে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। একটা বড় অংশের সমাজের ধারণা হলো, আদিবাসীরা মানে নিঃস্ব, গরিব, অনেক দাবি-দাওয়া নিয়ে তারা আসে। কথাটা সত্য। কিন্তু আপনি দেখবেন, আদিবাসীদের অনেক অবদান এবং কন্ট্রিবিউশন আমরা বলি। মানে ইনডিজেনাস পিপলস কনট্রিবিউশন ফর এনভারনমেন্ট, বন, পরিবেশ, ভূমি, এই যে সমুদ্র, সাগর, জীববৈচিত্র্যের জন্য অবদান। এটা জাতিসংঘের বক্তব্য।

বাংলাদেশে আপনি তাকিয়ে দেখেন, বাংলাদেশে পাহাড়, বন, নদী, পর্বত, জীববৈচিত্র্য কে রক্ষা করে? পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়, খাসিয়া পাহাড়, গারো পাহাড়, সুন্দরবন ছিল একসময়, গাজীপুরের বন ছিল, মধুপুরের বন, আদিবাসী মানুষেরাই ছিল। জাতিসংঘের একটি তথ্য, এই পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ আদিবাসী। এই ৬ শতাংশ মানুষ এই পৃথিবীর ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে।

এই যে আমাজন রেইনফরেস্ট, পৃথিবীতে যে সবচেয়ে বড়, ইউরোপের অক্সিজেন বলা হয়, নর্থ আমেরিকায়, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, মানে এসব দেশে আমাজন ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু সংরক্ষণ করে কারা? আদিবাসীরা। কারণ আদিবাসী মানুষের জীবনের সঙ্গে বন, পাহাড়, নদী এগুলোর মিল আছে।

এই যে ধরেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বন উজাড় হচ্ছে, মধুপুরের বন উজাড় হচ্ছে, অবশ্যই আদিবাসী মানুষের কারণে না। এটা হলো মুনাফার কারণে। এই বন, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য বা নদীকে যে মুনাফার অংশ হিসেবে দেখে, দখল করে, এই নদী দখল করো, এই মাছের ঘের করো, বন দখল করো, উজাড় করো। কিন্তু এসব রক্ষায় আদিবাসী মানুষের অনেক অবদান।

আপনি দেখবেন, পাহাড়, বন, নদী, ভূমি দখল, এগুলোতে আদিবাসী মানুষ জড়িত নেই। এই যে বাংলাদেশে এতগুলো ব্যাংক উজাড় করে লুটপাট করে চলে গেছে, আপনি আমাকে নাম দেন, একজন আদিবাসীর নাম দেন আপনি, চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, আছে? একজনও নেই!

এই যে নদী দখল করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, আদিবাসীর নাম দেন, একজনও নেই। এই যে তত্ত্বাবধায়কের আমলে ভোলাগঞ্জ, সিলেটে পাথর নিয়ে গেছে, একজন আদিবাসী নিয়েছে কিনা পাথর? একজনও নেই। কারণ প্রকৃতির সঙ্গে, বনের সঙ্গে আমাদের অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্ক ছিল। একজন আরেকজনের পরিপূরক। আমরা বন ধ্বংস করব না, উজাড় করব না, প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেবে না।

এটা নিয়ে অনেক সাহিত্য, স্টোরি আছে, ফিল্ম আছে, অ্যাভাটার, জেমস ক্যামেরনের ফিল্ম অ্যাভাটার। তো আমি বলবো, আমাদের যে অবদান আছে, সেই অবদানের সঙ্গে আমাদের মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের ও তরুণদের অধিকার সচেতন করে তুলতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব, নাগরিক সমাজের দায়িত্ব, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিওদের দায়িত্ব। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় করতে পারে, জাতিসংঘ এ কাজগুলো করতে পারে, সরকারও করতে পারে।