ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনির্মাণকে সামনে রেখে আন্দোলনের যৌথ রূপরেখার খসড়া তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে বিএনপি ও দলটির সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে যুক্ত বিরোধী দলগুলো। আগামী কয়েক দিন এই খসড়া নিয়ে বিদ্যমান বিরোধী জোটগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করবে। এক্ষেত্রে চলতি মে মাসেই যুগপতে যুক্ত বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করতে চায় বিএনপি।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে চূড়ান্ত আন্দোলনের সময়সীমা সাধারণত স্বল্প পরিসরে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা এবং দেশি-বিদেশি পক্ষগুলোকে সমন্বয় করা কঠিন। এ কারণে যথাযোগ্য সময়ে যৌথ রূপরেখার ঘোষণা দেওয়ার পক্ষে যুগপতে যুক্ত বিরোধী দলীয় নেতারা।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগ, আগামী নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কীভাবে চলবে—তার ওপর ভিত্তি করে যৌথ ঘোষণাপত্রের ড্রাফটিং চলছে। রাজনৈতিক দাবি তো পরিবর্তনযোগ্য। আন্দোলনের কর্মসূচিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে, এখন ড্রাফট বিনিময় হবে। সেটা চূড়ান্ত হওয়ার পর সব জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে যৌথ ঘোষণার যথাযোগ্য সময় ঠিক করা হবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা বলছেন, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে ২৭ দফা ঘোষণা করা হয়। এর আগে ওই বছরের ৮ আগস্ট গণতন্ত্র মঞ্চ ১৪ দফা, ১৮ ফেব্রুয়ারি গণসংহতি আন্দোলন ১৪ দফা দেয়। এরপর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের পক্ষ থেকেও আন্দোলন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব দেয়।
নেতারা জানান, এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে ন্যূনতম সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে। আলোচনা অনুযায়ী, এ বছর বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটি মিলে ‘সরকার ও শাসনব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের সাত দফা’ চূড়ান্ত করা হয়। পরে গত ১৩ এপ্রিল বিএনপির পক্ষ থেকে আকস্মিকভাবে ২৭ দফাকে কেন্দ্র করে যৌথ ঘোষণার প্রস্তাব আনা হয়।
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটি যৌথভাবে আন্দোলনের সাত দফা প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন প্রস্তাব আসার পর বিষয়টি নতুন আঙ্গিকে হচ্ছে। আশা করি, আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ রূপরেখার ঘোষণা আসবে। ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সব দলকে একসঙ্গে নিয়ে রূপরেখা ঘোষণার প্রস্তাব করেছেন। আশা করি সেভাবেই এগোবে।’
নুরুল হক নুরের ভাষ্য, ‘বেশি আগে-ভাগে আন্দোলন করে প্রশাসন, বিদেশি শক্তিগুলোকে কতখানি সম্পৃক্ত করতে পারবো, সেটা বিবেচ্য। সরকারও দেনদরবার করছে, তারা কী করছে—সেটাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। এ কারণে আমরা নিজেরা আলাপ-আলোচনা করছি। আন্দোলনের মোমেনটাম তৈরি হলেই আমরা আমাদের রোডম্যাপের ঘোষণা দেবো।’
মঞ্চের একজন নেতা বলেন, ‘‘বিএনপির পক্ষ থেকে আন্দোলনের লক্ষ্যটাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কারণ, তারা মনে করে—‘এমনও হতে পারে সব দফারফা বাদ দিয়ে এক দফাতেই যেতে হতে পারে’। সেক্ষেত্রে কত দফা, সেটা মুখ্য নয়।’’
বিএনপির সঙ্গে যুগপতে যুক্ত ১২ দলীয় জোট। এই জোটের শরিক বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘যৌথ রূপরেখা নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটসহ নানা দল ও সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়টি দ্রুততার সঙ্গে সামনে আসবে।’
‘কর্মসূচির ক্ষেত্রে কোনও কোনও নেতা কোরবানি ঈদের আগে, আবার কোনও নেতা জুলাইয়ের মধ্যেই— অর্থাৎ মে থেকে জুনের মধ্যেই চূড়ান্ত কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে যৌথ ঘোষণার বিষয়টি বিলম্বিত হওয়ার কারণ নেই’ বলে জানান শাহাদাত হোসেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টা হচ্ছে, আমরা প্রত্যেকটি দলই কিন্তু যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত। আমাদের দলের পক্ষ থেকে ২৭ দফা, ১০ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য বিরোধী দল তাদের দাবি ও নিজস্ব চিন্তা নিয়ে কাজ করছে। এখন এটাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার কাজ হচ্ছে। আশা করি দ্রুততার সঙ্গে এর সুরাহা হবে। তবে দিনক্ষণ বলার কোনও সুযোগ নেই।’
গণতন্ত্র মঞ্চ ত্যাগ করতে পারে গণঅধিকার পরিষদ, শনিবার সিদ্ধান্ত
দৃশ্যত যৌথ রূপরেখার ঘোষণা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চ কাজ করলেও ভেতরে ভেতরে নিজেদের বিরোধ নিয়ে দোলাচলে রয়েছেন মঞ্চের নেতারা। ইতোমধ্যে মঞ্চের শরিক গণঅধিকার পরিষদকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন নেতারা।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, মঞ্চ গঠনের শুরু থেকেই গণঅধিকার পরিষদের তরুণ নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেওয়া, সমাবেশে অংশগ্রহণসহ অনেক বিষয়ে অসন্তোষ ছিল। বিগত রমজানে এই অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
মঞ্চের শরিক একটি দলের প্রধান জানান, রমজানে গণঅধিকার পরিষদের নেতা রাশেদ খান প্রকাশ্যেই বিরূপ আচরণ করেন। এরপর একাধিক বৈঠকে দলটির প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও সোমবার (৩ মে) গণতন্ত্র মঞ্চের বৈঠকে যোগ দেন রাশেদ খান। তিনি বৈঠকে তরুণ হিসেবে বিষয়গুলো (বিরূপ আচরণ) বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
আরেক নেতার ভাষ্য, আগামী শুক্রবার শাহবাগে মঞ্চের পক্ষ থেকে সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছে। ওই সমাবেশে গণঅধিকার পরিষদ আসে কিনা, তারপরই স্পষ্ট হবে তাদের অবস্থান।
মঞ্চের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনও কোনও শরিক এরইমধ্যে গণঅধিকার পরিষদকে মঞ্চ থেকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলে।
প্রসঙ্গক্রমে গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর বলেন, ‘বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ একটি দল হিসেবে যুগপৎ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। গণতন্ত্র মঞ্চ তো নেতৃত্বস্থানীয় জায়গায় নেই। নানা কারণেই কিছু অসন্তুষ্টির জায়গা তৈরি হয়েছে। আমাদের নেতাদের মূল্যায়ন না হওয়ার বিষয়টি দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।’
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে নুরুল হক আরও উল্লেখ করেন, গণঅধিকার পরিষদ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকবে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে স্বতন্ত্র যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা তৈরি করার বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের মতামত রয়েছে। সেক্ষেত্রে গণতন্ত্র মঞ্চে না থাকলেও যুগপতে থাকবো।’
তাহলে কি গণঅধিকার পরিষদ গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক নুর বলেন, ‘আগামীকাল (শনিবার) কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং আছে। নেতাদের অনেকেই মঞ্চের ব্যাপারে হ্যাপি না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শনিবার নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘গণঅধিকার পরিষদ বেশ কিছু মিটিংয়ে অনুপস্থিত ছিল। সর্বশেষ গত ৩ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাদের নেতা রাশেদ খানসহ তিন জন এসেছিলেন। তারা এসে জানিয়েছেন, তারা মঞ্চে থাকতে চান। আমরা অবশ্য রেসপন্স করিনি এখনও। কারণ, আগামী রবিবার (৭ মে) মঞ্চের বৈঠক আছে। সে বৈঠকে যৌথ ঘোষণাপত্র ও গণঅধিকার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।’
আরও পড়ুন:
যৌথ রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্য হয়নি: দুই ঈদের মাঝে আন্দোলনের ফসল তুলতে চায় বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো