‘সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না, সুষ্ঠু ন্যায় বিচারও সম্ভব না’

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমণ্ডলির সদস্য ও সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ‘সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না, তাহলে সুষ্ঠু ন্যায় বিচারও সম্ভব না। সংস্কার ছাড়া ট্রাইব্যুনাল করলেন কেন? যদি সংস্কার ছাড়া নির্বাচন শুদ্ধ না হয়। তাহলে সংস্কার না করে বিচার ব্যবস্থার ভেতরেও তো রোগ রয়ে গেছে। ন্যায় বিচার তো পাওয়া যাবে না। আর এই সরকার যদি দলীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে নিরপেক্ষ নির্বাচনও এই সরকারের অধীনে সম্ভব নয়।’

শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে বাংলাদেশ জাসদের ৫৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

দেড় বছর পার হলেও এক ইঞ্চিও বৈষম্য দূর হয়নি বলেও মন্তব্য করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, ‘দেশ ভয়ঙ্কর একটা পরিস্থিতি চলছে। বলতে হয় সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিব কোথায়? দেশের এক জায়গায় মলম লাগাবেন আরেক জায়গায় ফোড়া বের হবে। টোটকা-ফোটকায় কাজ হবে না। একটা সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা আজ ফরজ হয়ে গেছে।’

কেউ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বারবার আমরা ঠকি। কেন ঠকি? জমি বর্গা দেওয়া যায় স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। হাসিনাকে বর্গা দিয়ে ঠকে গেছি। খালেদাকে বর্গা দিয়ে ঠকে গেছি। ইউনুসকে বর্গা দিয়ে ঠকে যাচ্ছি। এরাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দেশ চালাইছে, লুটপাটতন্ত্র কায়েম হয়েছে লুটপাটের রাজত্ব বহাল রাখার জন্য। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে, এমনকি ভোটাধিকার পর্যন্ত হরণ করেছে।’

জামায়াতে ইসলাম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জামাতে ইসলামের সম্পর্কে বলতেছি যে, তাদের তো বাংলাদেশের মাটিতে অফিস করার, তৎপরতা চালানোর কোনও অধিকার নাই। কিন্তু সে জোর করে এখানে থাকছে কেন? একটা গভীর ষড়যন্ত্রের জাল। সে বলে যে সংস্কার চাই পরিবর্তন চাই এবং আগে আগে আমার এইখানে গণভোট দিতে হবে।’

বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘দেশ এখন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছে। ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। একটা অরাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী অভ্যুত্থান হয়েছে। আমরা নৈতিকভাবে সাপোর্ট করেছি। কিন্তু তারপরে যে চেহারা-সুরত আবির্ভূত হয়েছে, এক কথায় বলতে গেলে বিদেশি মনোনীত একটা সরকার হয়েছে। যদিও উনি (ইউনুস) নিজেকে হালাল করবার জন্য বলেছেন যে ছাত্ররা তাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এই সরকারের কাছ থেকে আমরা খুব কিছু আশা করি না এখন।’

তিনি  বলেন, ‘আমরা বটম লাইনে চলে গেছি। উনি যাতে ইলেকশনটা দিয়ে চলে যান। তিনি শুরুতে বলেছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাক করতে পাঁচ বছর লাগবে। জনগণের দাবির প্রেক্ষাপটে ২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দেবেন বলেছেন। তিনি এনসিপি, জামাত আর বিএনপির সঙ্গে আলাপ করেন, সলাপরামর্শ করেন। মাঝে মাঝে এটাকে হালাল করতে আমাদের সবাইকে ডাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারকে সাপোর্ট করতে জাতীয় ঐক্যমত্যের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি, প্রত্যেকটা বৈঠক থেকে প্রত্যেকটা ইস্যুতে ‍সরকারকে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যের আলোচনা করে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে দেশের মানুষ যদি মনে করে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, আমি মনে করি সেটা ভুল করবে না। আলোচনায় যেসব বিষয়ে ন্যূনতম ঐক্য থাকবে সেটার ওপর ভিত্তি করেই সনদ হবে। কিন্তু এখন দেখা গেল যেগুলো নোট অফ ডিসেন্ট বাদ দিয়ে তারপরে সনদ করছেন, এটা প্রতারণা।’

জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যদি এটা করতে চান উনি, জনতার মুখোমুখি হতে হবে তাকে। কাজেই সব বাদ দিয়ে ইলেকশনটা দিয়ে দেন। সক্রিয় সকল রাজনৈতিক দল গণপরিষদের যে আলোচনা যে প্রতিশ্রুতি আছে এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে ন্যূনতম আলোচনায় ঐক্যমত্য গঠিত হয়েছে সেটার ওপর ভিত্তি করে অবশ্যই তারা তাদের রাজনৈতিক পরবর্তী পরিক্রমায় সেগুলো পালন করবে। এখানে সন্দেহ করার কোনও অবকাশ নেই। অভ্যুত্থানকারী ছাত্র প্রতিনিধিদের মন্ত্রীসভায় (উপদেষ্টা পরিষদে) আসার সুযোগ করে দিয়ে যুব সমাজকে ধ্বংস করা হয়েছে।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক দুর্যোগের ঘনঘটা। একটা গভীর সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ নিপতিত হচ্ছে। একটা গভীর খাদের কিনারে এসে বাংলাদেশ উপনীত হয়েছে। এই জায়গা থেকে দেশকে রক্ষার জন্য যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো আছে বা ক্ষমতা প্রত্যাশী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে বা স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে তাদের পক্ষে বাংলাদেশের এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনও সুযোগ নাই, সম্ভব না। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে এখানকার বাম গণতান্ত্রিক যে প্রগতিশীল শক্তি আছে দেশপ্রেমিক শক্তি আছে তাদেরই ঐক্যবদ্ধভাবে একটা পথ এবং পন্থা উদ্ভাবন করতে হবে।’

বজলুল রশীদ বলেন, ‘ছাত্রনেতারা যারা এই যে কিংস পার্টি করলো, তাদের শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য দূর করার জন্য কোনও বক্তব্য আছে...কোন কথা আছে। তারা বলে সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিবে, মুক্তিযুদ্ধকে বাতিল করে দিবে, তারপরে রিসেট বাটন টিপে দিবে। দ্বিতীয় স্বাধীনতা নাকি অর্জন হয়েছে এই সমস্ত বকাওয়াজ বক্তব্যগুলো তারা দিচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায় যে এদের উদ্দেশ্যটা কি। বাস্তবে এদের উদ্দেশ্য...যারা ২৪ এ গণঅভ্যুত্থান দিয়ে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ মুছে ফেলতে চায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান কবরে পাঠিয়ে দিতে চায় তাদের কিন্তু উদ্দেশ্যের মধ্যে যে গলদ আছে। সেটা বোঝা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশে যদি জনমতকে উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে এখানে নতুন করে যদি কোনও ষড়যন্ত্র হয়; কমিশনের যে জুলাই সনদ নিয়ে যেই ধরনের ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত... তাহলে এই সমস্ত ঐক্যমত্য কমিশনের সদস্যরা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের মীরজাফর হিসেবে আখ্যায়িত হবে।’

জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘অভ্যুত্থান শহীদদের চেতনা ধারণ করে বলতে চাই, একটা বিষয় খুব পরিষ্কার করে বলা দরকার, আজকে অভ্যুত্থান বিজয়ের পর একটা জিকির উঠে গেল একাত্তরের সংবিধানের কারণে নাকি স্বৈরতন্ত্র হয়েছে ফ্যাসিস্ট হয়েছে। এটাকে রাখা যাবে না। চলে আসল সংস্কারের কথা। ইউনুস সাহেব বৈষম্য বলে ক্ষমতায় গেছেন কত আরাম… বৈষম্য কথা বলে উনি টিভির লাইসেন্সও দিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের এই যে ফ্যাসিজম...আমি মনে করি এটা একটা অসুখ, রাজনীতির সর্বোচ্চ রোগ হচ্ছে ফ্যাসিজম।’

তিনি বলেন, ‘আমি আজ যে কথাটা বলতে চাচ্ছি, এই যে অসুখ, এই অসুখ সবাইকে ধরে, ক্ষমতায় গেলে যদি যৌক্তিক বিরোধী দল না থাকে। যেমন বিএনপি দুইবার আক্রান্ত হয়েছিলেন সেই রোগে, শেখ হাসিনা ঝাড়ফুঁক করে ভালো করে দিয়েছে। আর শেখ হাসিনা যখন সেই রোগে আক্রান্ত হলেন তখন বিএনপি পারে নাই। কেন পারে নাই...বিএনপি জামাতের সঙ্গে এমন করে জড়িয়ে পড়েছিল না পারছে মুক্তিযুদ্ধ গ্রহণ করতে, না পারছে রাজাকার গ্রহণ করতে। আজ সেই কারণে বিএনপি এই যে তথা সংস্কারের কাছে গিয়ে মাথা নত করে।’

তিনি বলেন, ‘আজ যারা সংস্কার কথা বলে মুক্তিযোদ্ধাকে বাদ করে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বলে তাদের উদ্দেশ্যে বলব, এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ থাকবে, জয় বাংলা থাকবে, বঙ্গবন্ধু থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনও দলীয় বয়ান মুক্তিযুদ্ধের আমরা শুনতে চাই না।’

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়ার সভাপতিত্বে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য রোকনুজ্জামান রোকন, আনোয়ারুল ইসলাম বাবু, বাদল খান, করিম শিকদার, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মুশতাক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য সোহেল আহমেদ,  বাসদের (মার্কসবাদী)  সমন্বয়ক মাসুদ রানা প্রমুখ।