অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইন টেস্টে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছেন আরও একটি বিরল তালিকায়। পাকিস্তানের কিংবদন্তি হানিফ মোহাম্মদের পর অস্ট্রেলিয়ায় নিজের প্রথম টেস্ট ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় এশিয়ান ব্যাটার তানজিদ। হানিফ মোহাম্মদ সর্বশেষ এই কীর্তি গড়েছিলেন ১৯৬৪ সালে মেলবোর্নে।
শুধু তাই নয়, ২০২০ সালে যুব বিশ্বকাপজয়ী বাংলাদেশ দলেরও সদস্য ছিলেন তানজিদ। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে এসে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। তবে তানজিদের এই সাফল্যের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার এই সন্তানকে একসময় তার বাবা ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে চাননি। এমনকি ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকায় একপর্যায়ে তাকে বাসা থেকেও বের করে দিয়েছিলেন।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই দিনের কথা স্মরণ করে তানজিদ বলেছিলেন, ‘আব্বু সরকারি চাকরি করতেন। আমার পড়াশোনার কারণেই আমাদের দুই ভাই-বোনকে শহরে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকার কারণে আমার বাবা আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। সারাদিন খেলাধুলা করে বাসায় ফেরার পর আব্বু অনেক বকাঝকা করে আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। আব্বু ভাবতেন এই খেলাধুলার কারণে আমি দুই কূলই হারাবো।’
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যায় পরিস্থিতি। ক্রিকেটে তানজিদের উন্নতির গ্রাফ দেখে ধীরে ধীরে তার বাবা মেনে নেন ছেলের স্বপ্নকে। এর পেছনে ছিল তানজিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। তানজিদের ভাষায়, ‘যখন দেখলেন বিভাগীয় পর্যায়ে খেলে ভালো করছি, তখন থেকে ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। তবে আম্মুর সমর্থন না পেলে কঠিন হয়ে যেতো ক্রিকেট খেলা।’
নিজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথে মায়ের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তানজিদ। তিনি বলেন, ‘‘আম্মু তখন আস্তে আস্তে আব্বুকে বোঝান। তারপরেও আব্বু রাগত স্বরে আম্মুকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলে তুমি যা বোঝো করো।’ বারবার বোঝানোর পর আব্বু রাজি হন।’’
শৈশব থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তানজিদ। বগুড়া জেলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। নিজের ক্রিকেটে হাতেখড়ির গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হবো। আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে বগুড়া জেলা স্কুলে পড়ি। আমার রুমের পাশেই একটা খোলা জায়গা ছিল। ওখানে এক বড় ভাই নিয়মিত ক্রিকেট খেলতন, অনুশীলন করতেন। তাকে দেখে খুব ইচ্ছে হতো ক্রিকেট খেলার। আমি জানালা দিয়ে দেখতাম ভাইয়া কীভাবে খেলতন, ভাইয়ের নাম সজল। আমি যখন মাঠে যেতাম, সজল ভাই আমাকে শেখাতন। আসলে ওনার কাছেই আমার ক্রিকেটের হাতেখড়ি।’
এরপর ক্রিকেটের পথচলা আরও এগিয়ে যায়। তানজিদ বলেন, ‘জেলা স্কুলে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর ভাইয়ার সঙ্গে অনুশীলন করতে থাকি। এরপর বগুড়াতে অনূর্ধ্ব-১৪ এ ট্রায়াল হয়। প্রথমে বগুড়া জেলা দলের হয়ে খেলে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ হয়। এভাবে বয়সভিত্তিক সব ধাপ পার হয়ে ২০১৭ সালে আমি ভর্তি হই বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে। ওখানে এক বছর কোচিং করার পর প্রথম বিভাগে উত্তরা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে সুযোগ পাই। প্রথম বিভাগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলাম। ১২ ম্যাচে ৬৩০-এর মতো রান করেছিলাম।’