‘ইমরান জাতীয় বীর, তার কিছু হলে কাঁদবে পুরো পাকিস্তান’

একসময় একই মাঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের জন্য লড়েছেন। ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক রাতে দুজনের ব্যাটেই লেখা হয়েছিল পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়। সময়ের স্রোতে সম্পর্কের উষ্ণতা কমেছে, এসেছে তিক্ততাও। কিন্তু সাবেক সতীর্থ ইমরান খান আজ কারাগারে। এ দৃশ্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না জাভেদ মিয়াঁদাদ। কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পাকিস্তানের এই কিংবদন্তি ক্রিকেটার। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, ইমরানকে মুক্তি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে।

ন্যারেটিভসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মহলের প্রতি ইমরানের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান। মিয়াঁদাদ বলেন, ‘কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। সে কি পাকিস্তানকে খেয়ে ফেলবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘সবাইকে বিষয়টি দেখতে হবে এবং বুঝতে হবে। আমরা সবাই পাকিস্তানি।’

খেলার সময় ইমরান ও তার মধ্যে কোনো ধরনের শত্রুতা বা ঈর্ষা ছিল-এমন ধারণাও উড়িয়ে দেন মিয়াঁদাদ, ‘কোনো ধরনের শত্রুতা ছিল না। আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়াও হয়নি।’

ইমরানের সঙ্গে ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার স্মৃতিও তুলে ধরেন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, ‘ইমরান আর আমি একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেটও খেলেছি। ইংল্যান্ডে ছয় মাস আমরা একসঙ্গে থেকেছি, খেয়েছি এবং সময় কাটিয়েছি। পরে পাকিস্তান দলে আমি তাকে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। আমরা একসঙ্গে ক্রিকেটের একটি দারুণ সময় কাটিয়েছি।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রের ব্যক্তিদের একসঙ্গে বসে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি, ‘একসঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করা উচিত। সমস্যা যা-ই হোক, পাকিস্তানের এখন সেটিই প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিকে অযথা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়।’

ইমরানের ব্যক্তিগত দিকটির কথাও তুলে ধরেন তিনি, ‘সেও কারও সন্তান। প্রায়ই আমার মনে হয়, বেচারা মানুষটি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে! আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি, সময় কাটিয়েছি এবং একে অন্যকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম। একসঙ্গে আমরা পাকিস্তানকে এত দূর নিয়ে গিয়েছিলাম।’

১৯৯২ বিশ্বকাপের সেই স্মরণীয় ফাইনালের কথাও ফিরে আসে মিয়াঁদাদের বক্তব্যে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে তৃতীয় উইকেটে ইমরান খান ও মিয়াঁদাদ মিলে গড়েছিলেন ১৩৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। সেই জুটিই পাকিস্তানের প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পথে বড় ভূমিকা রাখে।

তবে অবসরের পর তাদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়। ইমরান খানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন মিয়াঁদাদ।

তবু তিনি জানান, এবার যা বলছেন, তা হৃদয় থেকেই বলছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জন্য ইমরানের অবদান ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ৬৯ বছর বয়সী মিয়াঁদাদ বলেন, ‘যা ভুল, তা ভুলই। অবশ্যই সে একজন জাতীয় বীর।’

এরপর পাকিস্তান সরকারের প্রতিও আবেদন জানান তিনি, ‘আমি প্রার্থনা করি, এই সমস্যার সমাধান হোক। আমি পাকিস্তান সরকারের কাছেও আবেদন করছি। হয়তো অনেক কিছু বলার অবস্থানে আমি নেই। তবে এটুকু বলতে পারি—সে আমার সহকর্মী। আমরা অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি, একসঙ্গে খেলেছি।’

ইমরানকে খুব কাছ থেকে চেনেন বলেও দাবি করেন মিয়াঁদাদ, ‘ইমরান সম্পর্কে আমি সবকিছু জানি। সে একজন সৎ মানুষ।’

ইমরানের প্রসঙ্গ উঠতেই আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মিয়াঁদাদ। তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, ‘আমার প্রার্থনা, যা সঠিক সেটিই যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর চেয়ে বেশি কী বলতে পারি? আপনারা আমার চোখে পানি এনে দিয়েছেন। আমি যা বলছি, হৃদয় থেকেই বলছি।’

মিয়াঁদাদ আরও বলেন, ‘আমি যদি কিছু করতে পারি, অবশ্যই করবো। আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমরা সবাই পাকিস্তানের পতাকা বহন করেছি। অন্য সব পার্থক্য এখন শেষ হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের দিক থেকে সে কারও চেয়ে কম নয়।’

ইমরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ও স্মরণ করিয়ে দেন মিয়াঁদাদ, ‘সে এমন একজন ব্যক্তি, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোনো অভিযোগ নেই, ওই ধরনের কোনো অভিযোগও নেই।’

ইমরানের কিছু হলে পাকিস্তানের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন মিয়াঁদাদ, ‘সৃষ্টিকর্তা না করুন, তার যদি কিছু ঘটে, তাহলে দেশে কী ঘটবে, কল্পনা করতে পারেন? পুরো পাকিস্তান কাঁদবে।’

এরপর আরও আবেগঘন কণ্ঠে সাবেক সতীর্থের পক্ষে দাঁড়ান পাকিস্তানের এই কিংবদন্তি, ‘সে কিছু চুরি করেনি। পাকিস্তানের জন্য নিজের সময় এবং সবকিছু দিয়েছে। সে এত বড় একজন ক্রিকেট কিংবদন্তি। বিষয়টির সমাধান করুন।’