দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও থামেননি, এক চোখে ৪৬ টেস্টে ২৭৯৩ রান!

ক্যারিয়ার শুরুর আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো তার ক্রিকেট-জীবন। ভয়াবহ এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিলেন। চিকিৎসকও বলে দিয়েছিলেন, এক চোখ দিয়ে ক্রিকেট খেলাই তার জন্য ভালো। কিন্তু সেই কথাকে ভাগ্যের শেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নেননি নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি। এক চোখের সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেই তিনি ফিরে এসেছিলেন ক্রিকেটে। খেলেছেন ৪৬ টেস্ট, করেছেন ২ হাজার ৭৯৩ রান। ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে হয়ে যান দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধিনায়ক।

আজও ক্রিকেটের অন্যতম অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প হয়ে আছে পতৌদির ক্যারিয়ার। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর কীভাবে নিজের ব্যাটিংকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছিলেন ভারতের এই কিংবদন্তি, সেটিই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।

১৯৪১ সালের ৫ জানুয়ারি জন্ম মনসুর আলী খান পতৌদির। যিনি ছিলেন ভারতের পতৌদি পরিবারের শেষ ও নবম নবাব। 


১৯৬১ সালের ১ জুলাই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার জীবন ও ক্রিকেট ক্যারিয়ার আমূল বদলে যায়। হোভে সাসেক্সের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর সতীর্থদের সঙ্গে ব্রাইটনে রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন তিনি। ক্লান্তবোধ করায় সতীর্থদের সঙ্গে হেঁটে ফেরেননি। বরং উইকেটকিপার রবিন ওয়াটার্সের চালানো মরিস ১০০ গাড়িতে ওঠেন।

কয়েক মিনিট পরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। তাদের গাড়ির সামনে হঠাৎ চলে আসা আরেকটি গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

নিজের আত্মজীবনীতে পতৌদি লিখেছেন, ধাক্কা সামলাতে তিনি কোনোমতে ডান কাঁধটি ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। মুহূর্তেই গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর তার ধারণা হয়েছিল, হাত ভেঙেছে এবং কাঁধে গুরুতর চোট লেগেছে। চোট এতটাই গুরুতর ছিল যে প্রায় দুই বছর বল ছোড়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কিন্তু চোখে ব্যথা অনুভব না করায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন সেখানে কোনও সমস্যা হয়নি।

ভারতের অধিনায়ক ছিলেন মনসুর আলী খান পতৌদি।ব্রাইটনের হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরই চিকিৎসকের কাছ থেকে জানতে পারেন তার চোখে জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। উইন্ডস্ক্রিনের কাচের একটি টুকরো ঢুকে গিয়েছিল ডান চোখে। খ্যাতিমান সার্জন ডেভিড সেন্ট ক্লেয়ার রবার্টস অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু ক্ষতি ছিল ব্যাপক।

চোটের কারণে চোখের লেন্স গলে গিয়েছিল। আইরিসের ওপর একটি ঝিল্লি তৈরি হয়েছিল এবং চোখের মণি সেলাই করে দিতে হয়েছিল। ফলে ডান চোখে প্রায় কোনও দৃষ্টিশক্তিই অবশিষ্ট ছিল না। চোখটিও বেঁকে গিয়েছিল। সে সময় আরও উন্নতমানের অস্ত্রোপচারের সুযোগও ছিল না।

তবে দুর্ঘটনার পুরো প্রভাব তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন। প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ স্যার বেঞ্জামিন রাইক্রফট তাকে পরামর্শ দেন, কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করে প্রায় ৯০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেও ক্রিকেট খেলার ক্ষেত্রে সেটি উল্টো ক্ষতি করতে পারে। কারণ কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারে তার ডাবল ভিশন হচ্ছিল।

তাকে বলা হয়েছিল, ‘এক চোখ দিয়েই আপনার জন্য ক্রিকেট খেলা ভালো হবে।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা করে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা একজন তরুণ ক্রিকেটারের জন্য এমন চিকিৎসা-পরামর্শ নিঃসন্দেহে ছিল ভয়াবহ। কিন্তু পতৌদি বিষয়টিকে কখনও সেভাবে দেখেননি।

পরে তিনি লিখেছিলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্যও আমি ভাবিনি যে আর ক্রিকেট খেলতে পারবো না।’

পরাজয় মেনে না নেওয়ার সেই মানসিকতাই তার পুরো ক্যারিয়ারের নতুন মানে দাঁড় করিয়েছে। 

দৈনন্দিন জীবনও তার জন্য পরিণত হয় এক ধরনের অনুশীলনে। গভীরতা বোঝার ক্ষমতা বা ডেপথ পারসেপশনে সমস্যা হচ্ছিল। এমনকি সিগারেট ধরানোর সময় সেটির সম্মুখভাগ ঠিকমতো দেখতে পারতেন না। গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়ে টেবিলে পানি পড়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে বারবার চেষ্টা ও মনোযোগের মাধ্যমে নিজের শরীর ও দৃষ্টিকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখেন।

তার মা ও বোন ভারত থেকে এসে তার দেখাশোনায় সাহায্য করেছিলেন। এ সময় নিজের দৈনন্দিন কাজ নিজে করার সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ওপর জোর দেন পতৌদি।

তবে ক্রিকেটের দাবি ছিল আরও কঠিন। অস্ত্রোপচারের মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহ পরই তিনি আবার নেটে ফিরে যান। ঠিকমতো পড়াশোনা করতে না পারায় অক্সফোর্ড থেকে এক বছরের ছুটি পেলেও ক্রিকেট থেকে দূরে থাকেননি। দীর্ঘ সময় ধরে সাসেক্সের কোচ জর্জ কড তাকে বল করতেন। পতৌদি বোঝার চেষ্টা করতেন, তার ব্যাটিংয়ের কোন অংশগুলো এখনও আগের মতো আছে আর কোনগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে।

সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে একবার বলেছিলেন, ‘শুরুতে আমি বলের লেন্থ একেবারেই বুঝতে পারতাম না।’

শুধু একটি সচল চোখ নিয়ে খেলার ফলে বলের গতি ও বাউন্স বিচার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ডেপথ পারসেপশন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে তিনি নতুন এক সমাধান খুঁজে নেন। বলের লেন্থ দ্রুত বুঝে ফেলার ওপর কম নির্ভর করে টাইমিং, সহজাত প্রবৃত্তি এবং বোলারের অ্যাকশনের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেন।

নিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে তার প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছিল।

এর সঙ্গে বদলে যায় তার ব্যাটিং কৌশলও। হুক শট বাদ দেন তিনি, কারণ শরীর ঘুরে যাওয়ার পর বল অনুসরণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। হাফ-ভলিতে স্বাভাবিকভাবে ড্রাইভ করার প্রবণতাও কমিয়ে দেন, কারণ অনেক সময় ইয়র্কারে পরাস্ত হচ্ছিলেন। ধীরগতির স্পিন বল অনুসরণ করাও তার জন্য বিশেষ কঠিন ছিল। ফলে শুধু চোখের ওপর নির্ভর না করে বোলারের প্রচেষ্টা ও বলের গতিপথ বিচার করে শট খেলতে হতো তাকে।

তুলনামূলক দ্রুতগতির বোলিংই বেশি পছন্দ করতেন পতৌদি। বল একটু দেরিতে খেলতেন এবং শক্তির চেয়ে বলের প্লেসমেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য। দুর্ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের হয়ে টেস্ট অভিষেক হয় পতৌদির। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের পর মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেন তিনি।

মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী টেস্ট অধিনায়ক হন পতৌদি। এমন এক দলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যার আত্মবিশ্বাস ও সাফল্য দুটিই ছিল কম। কিন্তু তার নেতৃত্বে ভারত ধীরে ধীরে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করে।

৪৬ টেস্টে পতৌদি করেন ২ হাজার ৭৯৩ রান। তার নেতৃত্বে ভারত স্মরণীয় কিছু সিরিজ জয় পায়। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ভারতীয় দলের মাঝে এই বিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেন যে বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়াই করা সম্ভব।

তার প্রত্যাবর্তনের গল্পে ফিল্ডিংয়ের বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। অথচ সেখানেও তাকে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিতে হয়েছে। যে কাঁধে গুরুতর চোট লেগেছিল, সেটি দিয়ে থ্রো করাও সহজ ছিল না। কাছ থেকে ক্যাচ ধরাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবু পতৌদি ছিলেন চটপটে ও তীক্ষ্ণ। আগাম অনুমান এবং সঠিক জায়গায় অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতাও কাটিয়ে উঠেছিলেন।