ফিরে দেখা বিশ্বকাপ

১৯৯০: আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানদের প্রতিশোধ

দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসর। তার আগের প্রতিযোগিতাটিগুলো কেমন ছিল, কারাই বা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল- ফুটবল উৎসবের বানে ভেসে যাওয়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেখানে-

জার্মানদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতার আনন্দজার্মানদের স্বপ্ন ভেঙে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বীরত্বে মেক্সিকোর আসরে শিরোপা উদযাপন করেছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৯০ সালের আসরেও ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা-পশ্চিম জার্মানি। মেক্সিকোর আসরের হতাশা দূর করে জার্মানরা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রতিশোধ নিয়ে। ফাইনালে তারা ১-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো জেতে বিশ্বকাপ শিরোপা।

বিশ্বকাপের ১৪তম আসরের আয়োজক ছিল ইতালি। দ্বিতীয় দল হিসেবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের আয়োজক হয় ইউরোপের দেশটি, তাদের আগে মেক্সিকো দুইবার আয়োজন করেছিল বিশ্বকাপ (১৯৭০ ও ১৯৮৬)। বাছাই পর্বে অংশ নেওয়া ১১৬ দল থেকে মূল পর্বে জায়গা পায় ২২ দল, যারা যোগ দেয় আয়োজক ইতালি ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সঙ্গে।

১৯৯০ সালের আসরকে বিবেচনা করা ‘সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ’ হিসেবে। নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছিল পেনাল্টি শুট-আউটে, ম্যাচপ্রতি গোল গড় ছিল ২.২১, লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল ১৬বার, যেখানে আবার প্রথমবারের মতো ফাইনালে ছিল লাল কার্ড দেখানোর ঘটনা।

অন্য চোখে: প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় কোস্টারিকা, আয়ারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। হাই-ডেফিনেশন (এইচডি) ফরম্যাটে প্রথমবার সম্প্রচার করা হয় খেলা। ইতালির এই বিশ্বকাপেই শেষবার বিভক্ত জার্মানি অংশ নিয়েছিল। এরপর বার্লিনের দেয়াল ভেঙে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এক হয়ে যায়।

একনজরে:

আয়োজক: ইতালি

মোট দল: ২৪

ভেন্যু: ১২

চ্যাম্পিয়ন: পশ্চিম জার্মানি

রানার্স-আপ: আর্জেন্টিনা

মোট ম্যাচ: ৫২

মোট গোল: ১১৫

সর্বোচ্চ গোলদাতা: সালভাতোর স্কিলাচি (ইতালি), ৬ গোল।

সেরা খেলোয়াড়: সালভাতোর স্কিলাচি (ইতালি)।

সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: রবার্ত প্রোসিনেস্কি (যুগোস্লাভিয়া)।

ফরম্যাট:

আগের বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই হয়েছে ইতালির আসর। ২৪ দল ছয় গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের বিপক্ষে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা চার দল থেকে সেরা দুই দল নিশ্চিত করে নকআউট রাউন্ড। তাদের সঙ্গে তৃতীয় স্থানে পয়েন্টের দিক থেকে এগিয়ে থাকা চার দল সঙ্গী হয়েছে। ছয় গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপ মিলিয়ে ১২ দল ও সেরা তৃতীয় হিসেবে ৪ দল নিয়ে শুরু হয় শেষ ষোলো।

গ্রুপ পর্ব:

‘এ’ গ্রুপ থেকে দুই দল জায়গা পায় শেষ ষোলোতে, চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ইতালি ও রানার্স আপ হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া। ‘বি’ গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যায় তিন দল- ক্যামেরুন ও রোমানিয়ার সঙ্গে ‘বেস্ট থ্রি’ হিসেবে জায়গা পায় আর্জেন্টিনা। ‘সি’ গ্রুপ থেকে যায় দুই দল- ব্রাজিল ও কোস্টারিকা। ‘ডি’ গ্রুপ থেকে আসে পশ্চিম জার্মানি, যুগোস্লাভিয়া ও কলম্বো। ‘ই’ গ্রুপ থেকে তিন দল- স্পেন ও বেলজিয়ামের সঙ্গে তৃতীয় দল হিসেবে ‍সুযোগ পায় উরুগুয়ে। ‘এফ’ গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা পায় ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস।

শেষ ষোলো:

খুব কষ্টে নকআউট পর্ব উঠেছিল আর্জেন্টিনা। ‘বেস্ট থ্রি’ হিসেবে গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোনোর পর শেষ ষোলোতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের সামনে। গ্রুপ পর্বে দাপট দেখানো সেলেসাওরা অবশ্য পারেনি আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গে। ক্লাউদিও কানিজিয়ার লক্ষ্যভেদে ১-০ গোলের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখায় আর্জেন্টিনা।

পশ্চিম জার্মানি ২-১ গোলের জয় পায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। ইংল্যান্ড ১-০ গোলে হারায় বেলজিয়ামকে। স্বাগতিক ইতালি ২-০ গোলের জয় পায় উরুগুয়ের বিপক্ষে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে যুগোস্লাভিয়া ২-১ গোলে হারায় স্পেনকে। চেকোস্লোভাকিয়া ৪-১ গোলে কোস্টারিকাকে ও ক্যামেরুন ২-১ গোলে হারায় কলম্বিয়াকে। আর গোলশূ্ন্য ড্রয়ের পর আয়ারল্যান্ড টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে হারায় রোমানিয়াকে।

কোয়ার্টার ফাইনাল:

শেষ আটের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা-যুগোস্লাভিয়া। ম্যাচ ঘড়ির আধা ঘণ্টা সময় ১০ জনের দলে পরিণত হয় যুগোস্লাভিয়া, যদিও নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে কোনও গোল করতে দেয়নি। গোলশূন্য ড্রয়ের পর শেষ পর্যন্ত টাইবেকারে ৩-২ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে ওঠে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

আগের বিশ্বকাপের নায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা মিস করে বসেন পেনাল্টি শট। তৃতীয় শটে তিনি ব্যর্থ হওয়ার পর চতুর্থ শটে পেদ্রো আন্তোনিও ত্রোগিলো বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হলে আর্জেন্টিনার মাথায় হাত। তবে সের্হিয়ো গয়কোচিয়ার বীরত্বে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। যুগোস্লাভিয়ার শেষ দুই পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক বনে যান এই গোলরক্ষক। অথচ তার খেলাই কথা ছিল না এই ম্যাচে! আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক নেরি পাম্পিদো গ্রুপ পর্বে পায়ে আঘাত পাওয়ায় সুযোগ পেয়েছিলেন গয়কোচিয়া।

লোথার ম্যাথাউসের পেনাল্টি গোলে চেকোস্লোভাকিয়াকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে পশ্চিম জার্মানি। স্বাগতিক ইতালিও একই ব্যবধানে হারায় আয়ারল্যান্ডকে। আর অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে ইংল্যান্ড ৩-২ গোলে হারায় ক্যামেরুনকে। গ্যারি লিনেকারের দুই পেনাল্টি গোলে ১৯৬৬ সালের পর আবার সেমিফাইনালে নাম লেখায় ইংলিশরা।

সেমিফাইনাল:

সেমিফাইনালের দুটি ম্যাচের ফলই নিষ্পত্তি হয়েছিল টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনা-ইতালি ও পশ্চিম জার্মানি-ইংল্যান্ড ম্যাচ দুটি নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়েও ছিল ১-১ সমতা, শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুট-আউট জিতে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা ও পশ্চিম জার্মানি।

ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে ইতালি ১৭ মিনিটে এগিয়ে যায় সালভাতোর স্কিলাকির লক্ষ্যভেদে। তবে ৬৭ মিনিটে আর্জেন্টিনা সমতায় ফেরে ক্লাউদিও কানিজিয়া জাল খুঁজে পেলে। ১-১ সমতায় ম্যাচ শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা পায় ৪-৩ গোলের জয়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানি এগিয়ে যায় ৬০ মিনিটে। আন্দ্রেস ব্রেহমির লক্ষ্যভেদে জয়ের পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল জার্মানরা, তবে ৮০ মিনিটে গ্যারি লিনেকারের গোলে সমতায় ফেরে ইংলিশরা। ১-১ সমতায় ম্যাচ শেষ হওয়ায় পেনাল্টি শুট-আউটে গড়ানো সেমিফাইনাল ৪-৩ গোলে জিতে নেয় পশ্চিম জার্মানি।

রেফারির সঙ্গে ম্যারাডোনার বাদানুবাদ, ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালেফাইনাল:

জার্মানদের সামনে ছিল আগের বিশ্বকাপের যন্ত্রণা দূর করে প্রতিশোধের পর্ব সেরে নেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সামনে ছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার। কিন্তু ১০ জনের দল নিয়ে এবার আর পারেনি ম্যারাডোনারা। ৬৫ মিনিটে জার্মানির ইয়ুর্গেন কিন্সমানকে ফাউল করা পেদ্রো মোনজোন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা পরিণত হয় ১০ জনের দলে।

নিষেধাজ্ঞা ও ইনজুরিতে দুর্বল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়েছে জার্মানরা। তবে গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত, যখন মেক্সিকান রেফারি এদগার্দো কোদেসাল পশ্চিম জার্মানির পক্ষে বাজান পেনাল্টির বাঁশি। সুবর্ণ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্পট কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করেন আন্দ্রেস ব্রেহমি। গোল হজমের পরপরই গুস্তাভো দিজোত্তি লাল কার্ড দেখলে আর্জেন্টিনা খেলা থেকে একেবারেই ছিটকে যায়। শেষ পর্যন্ত ৯ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে পশ্চিম জার্মানি তৃতীয়বারের মতো ঘরে তোলে বিশ্বকাপ।