ফিরে দেখা বিশ্বকাপ

১৯৯৪: নিষিদ্ধ ম্যারাডোনা ও ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা

দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসর। তার আগের প্রতিযোগিতাটিগুলো কেমন ছিল, কারাই বা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল- ফুটবল উৎসবের বানে ভেসে যাওয়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেখানে-

ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা উদযাপন১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফুটবল মহাযজ্ঞের ১৫তম আসরের শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের জয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতে সেলেসাওরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ইতালিকে হারায় ব্রাজিল। সেবারই প্রথম কোনও ফাইনাল নিষ্পত্তি হয়েছিল পেনাল্টি শুট-আউটে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞা। ডোপ টেস্টে ‘পজিটিভ’ হওয়ায় গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ থেকে নিষিদ্ধ হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের আগে তার নিষেধাজ্ঞার খবর দেয় ফিফা।

অন্য চোখে: গ্রিস, নাইজেরিয়া ও সৌদি আরব প্রথমবার সুযোগ পায় বিশ্বকাপে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়াও প্রথমবার নামে ফুটবল মহাযজ্ঞে।

একনজরে:

আয়োজক: যুক্তরাষ্ট্র

মোট দল: ২৪

ভেন্যু:

চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল

রানার্স-আপ: ইতালি

মোট ম্যাচ: ৫২

মোট গোল: ১৪১

সর্বোচ্চ গোলদাতা: রিস্টো স্টইচকভ (বুলগেরিয়া), ওলেগ সালেঙ্কো (রাশিয়া)- দুজনই করেছেন ৬ গোল।

সেরা খেলোয়াড়: রোমারিও (ব্রাজিল)।

সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: মার্ক ওভারমার্স (নেদারল্যান্ডস)।

ফরম্যাট:

আগের বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আসর। ২৪ দল ছয় গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের বিপক্ষে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা চার দল থেকে সেরা দুই দল নিশ্চিত করে নকআউট রাউন্ড। তাদের সঙ্গে তৃতীয় স্থানে পয়েন্টের দিক থেকে এগিয়ে থাকা চার দল সঙ্গী হয়েছে। ছয় গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপ মিলিয়ে ১২ দল ও সেরা তৃতীয় হিসেবে ৪ দল নিয়ে শুরু হয় শেষ ষোলো।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাঠ ছাড়ছেন ম্যারাডোনাগ্রুপ পর্ব:

গ্রুপ পর্বেই নড়েচড়ে বসে ফুটবল বিশ্ব। ডোপ টেস্টে ‘পজিটিভ’ হওয়ায় ‘ডি’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগে নিষিদ্ধ হন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘হিরো’কে ছাড়া নকআউট পর্বে উঠলেও আলবিসেলেস্তেরা বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকেই। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের ছয় ঘণ্টা আগে ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার খবর দেয় ফিফা। ওই ম্যাচটি লাতিন দলটি হারে ০-২ গোলে।

‘এ’ গ্রুপ থেকে তিন দল জায়গা পায় শেষ ষোলোতে। রোমানিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ‘বেস্ট থ্রি’ হিসেবে যায় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ‘বি’ গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যায় দুই দল- ব্রাজিল ও সুইডেন। ‘সি’ গ্রুপ থেকেও যায় দুই দল- জার্মানি ও স্পেন। ‘ডি’ গ্রুপ থেকে আসে নাইজেরিয়া, বুলগেরিয়া ও আর্জেন্টিনা। ‘ই’ গ্রুপ থেকে তিন দল- মেক্সিকো ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে তৃতীয় দল হিসেবে ‍সুযোগ পায় ইতালি। ‘এফ’ গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা পায় নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব ও বেলজিয়াম।

শেষ ষোলো:

শেষ ষোলোতেই শেষ হয়ে যায় আগের বিশ্বকাপের রানার্স-আপ আর্জেন্টিনার দৌড়। ম্যারাডোনাবিহীন লাতিন দলটি ৩-২ গোলে হারে রোমানিয়ার বিপক্ষে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখায় ব্রাজিল। জার্মানি ৩-২ গোলে বেলজিয়ামকে, সুইডেন ৩-১ গোলে সৌদি আরবকে, ইতালি ২-১ গোলে নাইজেরিয়াকে, নেদারল্যান্ডস ২-০ গোলে আয়ারল্যান্ডকে ও স্পেন ৩-০ গোলে হারায় সুইজারল্যান্ডকে। আর বুলগেরিয়ার টাইব্রেকারে ৩-১ (১-১) গোলে হারায় মেক্সিকোকে।

কোয়ার্টার ফাইনাল:

রবার্তো ব্যাজিও’র দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ইতালি ২-১ গোলে স্পেনকে হারিয়ে নাম লেখায় সেমিফাইনালে। ইতালির হয়ে দুটো গোলই করেন ব্যাজিও। রোমারিও, বেবেতো ও ব্রাঙ্কোর গোলে ব্রাজিল ৩-২ গোলে হারায় নেদারল্যান্ডসকে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেয় বুলগেরিয়া ২-১ গোলের জয়ে। লোথার ম্যাথাউসের ৪৭ মিনিটের পেনাল্টি গোলে জার্মানরা এগিয়ে গেলেও ৭৫ মিনিটে স্টইচকভ ও ৭৮ মিনিটে জর্ডান লেচকভের লক্ষ্যভেদে সেমিতে ওঠে বুলগেরিয়া। রোমারিয়া-সুইডেন ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ২-২ গোলে ড্র থাকায় টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলের জয় পায় সুইডেন।

সেমিফাইনাল:

সেমিফাইনালেও চলেছে ব্যাজিও-জাদু। ২১ ও ২৫ মিনিটে তার দুর্দান্ত দুই গোলে ইতালি ২-১ ব্যবধানে হারায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো বুলগেরিয়াকে। অন্য সেমিফাইনালে ব্রাজিলের জয়ের নায়ক রোমারিও। সুইডেনের বিপক্ষে ৮০ মিনিট পর্যন্ত গোলহীনভাবে ছিল ব্রাজিল। তবে রোমারিও’র লক্ষ্যভেদে ১-০ গোলের জয়ে ফাইনালে নাম লেখায় সেলেসাওরা।

ফাইনাল:

রোজ বোল স্টেডিয়ামে ৯৪ হাজার দর্শকের সামনে চতুর্থ বিশ্বকাপ উদযাপন করে ব্রাজিল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ব্রাজিল ও ইতালি কোনও দলই গোল করতে পারেনি। ফল নিষ্পত্তির জন্য ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, সেখানে ৩-২ গোলের জয়ে বিশ্ব জয়ের উল্লাতে মাতে সাম্বার দেশ।

ইতালির হয়ে প্রথম শট লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন ফ্রাঙ্কো বারেসি। ব্রাজিলের নেওয়া প্রথম শটটিও মিস করেন মার্চিও সান্তোস। তবে রোমারিও, ব্রাঙ্কো ও দুঙ্গা- পরের তিন শটে লক্ষ্যভেদ করায় ব্রাজিলের হাতেই ওঠে বিশ্বকাপ। ইতালির নেওয়া পাঁচ শটের তিনটিই ব্যর্থ, গোটা টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করা ব্যাজিও পারেনি শেষ শটটি জালে জড়াতে। তাই দুঙ্গার স্পট কিক জালে জড়াতেই আনন্দে মাতোয়ারা ব্রাজিলিয়ানরা।