দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসর। তার আগের প্রতিযোগিতাটিগুলো কেমন ছিল, কারাই বা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল- ফুটবল উৎসবের বানে ভেসে যাওয়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেখানে-
বিশ্বকাপের ১৬তম আসরের আয়োজকের দায়িত্ব পায় ফ্রান্স ১৯৯২ সালে। ১৯৩৮ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় তারা। ৩২ দলের প্রথম বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব ১৯৯৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হয়ে চলে ১৯৯৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।
ফাইনালে আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের দুর্দান্ত পারফম্যান্সে ব্রাজিলিয়ান সাম্রাজ্য ভেঙে উৎসবে মাতে ফরাসিরা। স্তাদে দে ফ্রান্সের ফাইনালে জোড়া লক্ষ্যভেদ করা জিদানকে ফরাসি মিডিয়া নাম দেয় ‘গোল্ডেন বয়’। সপ্তম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স ষষ্ঠ আয়োজক হিসেবে মুঠোবন্দি করে শিরোপা। তাদের আগে উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি ও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল আয়োজক হিসেবে।
অন্য চোখে: প্রথমবার ফিফা আয়োজন করে ৩২ দলের বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের এই আসর দিয়েই প্রথমবার ফুটবল মহাযজ্ঞে খেলার সুযোগ পায় ক্রোয়েশিয়া, জ্যামাইকা, জাপান ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
একনজরে:
আয়োজক: ফ্রান্স
মোট দল: ৩২
ভেন্যু: ১০
চ্যাম্পিয়ন: ফ্রান্স
রানার্স-আপ: ব্রাজিল
মোট ম্যাচ: ৬৪
মোট গোল: ১৭১
সর্বোচ্চ গোলদাতা: ডেভর সুকার (ক্রোয়েশিয়া), ৬ গোল।
সেরা খেলোয়াড়: রোনালদো (ব্রাজিল)।
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: মাইকেল ওয়েন (ইংল্যান্ড)।
সেরা গোলরক্ষক: ফাবিয়েন বার্থেজ (ফ্রান্স)।
ফরম্যাট:
প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয় ৩২ দল নিয়ে। আগের আসরের ফরম্যাটে তাই বদল আসে এবার। ৩২ দল আট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের সঙ্গে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা ৪ দল নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার পর পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুই দল জায়গা করে নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে। এভাবে প্রত্যেক গ্রুপ থেকে আসা ২ দল নিয়ে নকআউট পর্ব শুরু হয় শেষ ষোলো দিয়ে। সেখানকার জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল হয়ে জায়গা করে নেয় ফাইনালে।
গ্রুপ পর্ব:
গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে ‘এ’ গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা পায় ব্রাজিল ও নরওয়ে। ‘বি’ গ্রুপ থেকে ইতালি ও চিলি, ‘সি’ গ্রুপ থেকে ফ্রান্স ও ডেনমার্ক, ‘ডি’ গ্রুপ থেকে নাইজেরিয়া ও প্যারাগুয়ে, ‘ই’ গ্রুপ থেকে নেদারল্যান্ডস ও মেক্সিকো, ‘এফ’ গ্রুপ থেকে জার্মানি ও যুগোস্লাভিয়া, ‘জি’ গ্রুপ থেকে রোমানিয়া ও ইংল্যান্ড এবং ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়া।
শেষ ষোলো:
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হেরে যাওয়ায় ঘুরে দাঁড়াতে মুখিয়ে ছিল ব্রাজিল। শেষ ষোলোতে তার কোপটা পড়ে চিলির ওপর। লাতিন আমেরিকান প্রতিপক্ষকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে সহজেই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। সিজার সাম্পাইয়োর জোড়া লক্ষ্যভেদের পর দুই গোল করেছিলেন রোনালদো। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়েছিল টাইব্রেকার জিতে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ২-২ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে আলবিসেলেস্তেরা পায় ৪-৩ গোলের জয়।
জার্মানি ২-১ গোলে হারায় মেক্সিকোকে। ডেভর সুকারের লক্ষ্যভেদে ক্রোয়েশিয়া ১-০ গোলে হারায় রোমানিয়াকে। নরওয়ের বিপক্ষে ইতালিও পায় একই ব্যবধানের জয়। নেদারল্যান্ডস ২-১ গোলে হারায় যুগোস্লাভিয়াকে। আর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে স্বাগতিক ফ্রান্স পায় ১-০ গোলের জয়।
কোয়ার্টার ফাইনাল:
কোয়ার্টার ফাইনালে বেজে যায় আর্জেন্টিনার বিদায়ঘণ্টা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে যায় আলবিসেলস্তেরা। ৭৬ মিনিটে ডাচদের আর্থার নুমান লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১-১ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনার আরিয়েল ওর্তেগা দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে জমে যায় ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিটে দেনিস বার্গকাম্পের লক্ষ্যভেদে সেমিফাইনালে ওঠে যায় নেদারল্যান্ডস।
ব্রাজিলের জয়রথ অবশ্য চালু থাকে। যদিও ডেনমার্কের বিপক্ষে সেলেসাওদের দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর বেবেতোর লক্ষ্যভেদে সমতা ফেরানো এবং রিভালদোর গোলে এগিয়ে গিয়ে প্রথমার্ধ শেষ করলেও বিরতি থেকে ঘুরে আসার পরপরই ডেনিসরা ফেরে খেলায়। তবে রিভালদো ৬০ মিনিটে দ্বিতীয়বার জাল খুঁজে পেলে জয়ের আনন্দে মাতে ব্রাজিল।
জার্মানিকে দাঁড়াতেই দেয়নি প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নামা ক্রোয়েশিয়া। সুকারদের সামনে জার্মানরা হারে ০-৩ গোলে। কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ফ্রান্স বিদায় করে দেয় ইতালিকে। গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে আজ্জুরিদের হারায় তারা ৪-৩ গোলে।
সেমিফাইনাল:
উত্তেজনাকর এক সেমিফাইনাল মঞ্চায়িত হয় মার্শেইয়ে। ব্রাজিল-নেদারল্যান্ডস ম্যাচের ৪৬ মিনিটে সেলেসাওরা এগিয়ে যায় রোনালদোর লক্ষ্যভেদে। ওই গোলেই ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে থাকে ব্রাজিলিয়ানরা। কিন্তু ৮৭ মিনিটে প্যাট্রিক ক্লাইভার্টের গোলে ডাচরা সমতায় ফেরলে জমে যায় ম্যাচ। খেলা গড়ায় তাই অতিরিক্ত সময়ে, সেখানেও কোনও দল গোল করতে না পারলে ফল নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। পেনাল্টি শুট আউটে ব্রাজিলের নেওয়া চারটি শট জালে জড়ালেও ডাচরা ব্যর্থ হয় দুইবার। তাতে ৪-২ গোলের জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠে ব্রাজিল।
ফ্রান্সের সামনে থামে দুর্দান্ত গতিতে ছোটা ক্রোয়েশিয়া। সুকারের গোলে ৪৬ মিনিটে এগিয়ে গেলেও পরপরই ফরাসিদের সমতায় ফেরান লিলিয়ান থুরাম। ৬৯ মিনিটে এই ডিফেন্ডারের দ্বিতীয় গোলেই ফ্রান্সের ফাইনাল নিশ্চিত হয় ২-১ ব্যবধানের জয়ে।
স্তাদে দে ফ্রান্সের ফাইনালে ফেভারিট ছিল ব্রাজিল। ফ্রান্স স্বাগতিক হলেও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পারফরম্যান্সে এগিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের। কিন্তু মাঠের ফুটবলে দেখা মেলে অন্য কিছুর। জিনেদিন জিদানের জাদুতে ফরাসিরা দাঁড়াতেই দেয়নি সেলেসাওদের। তাদের ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্ব জয়ের আনন্দে মাতে ফ্রান্স।
জুভেন্টাসে চমৎকার এক মৌসুম কাটিয়ে বিশ্বকাপে নেমেছিলেন জিদান। ফ্রান্সের এগিয়ে চলার পথে অবদান রাখলেও গোটা টুর্নামেন্টে একবারের জন্যও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি তিনি। ‘বড় মঞ্চের তারকা’ আসল জায়গাতেই জ্বলে উঠলেন। প্রথমার্ধেই জোড়া লক্ষ্যভেদ করে ব্রাজিলকে ছিটকে দেন ম্যাচ থেকে। ২৭ মিনিটের পর প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে দ্বিতীয়বার জাল খুঁজে পান তিনি। আর দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমে এমানুয়েল পেতিতের গোলে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবে মাতে ফ্রান্স।