দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ। রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসর। তার আগের প্রতিযোগিতাটিগুলো কেমন ছিল, কারাই বা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল- ফুটবল উৎসবের বানে ভেসে যাওয়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেখানে-
ফাইনালে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করে দেখেন লাল কার্ড। জিদান মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যান ফ্রান্সের বিশ্বকাপ-স্বপ্নটাও। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ফরাসিদের ৫-৩ গোলে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ইতালি।
বিশ্বকাপের ১৮তম আসরের আয়োজক ছিল জর্মানি। ঘরের মাঠে ফেভারিট হলেও সেমিফাইনালে আটকে যায় স্বাগতিকরা। তাদের হারিয়েই ফাইনালে ওঠে ইতালি। এই বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা নেওয়ার মিশনে বাছাই পর্বে অংশ নিয়েছিল ১৯৮ দেশ।
অন্য চোখে: সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো নাম নিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপে আসে দলটি, এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল যুগোস্লাভিয়া হিসেবে।
একনজরে:
আয়োজক: জার্মানি
মোট দল: ৩২
ভেন্যু: ১২
চ্যাম্পিয়ন: ইতালি
রানার্স-আপ: ফ্রান্স
মোট ম্যাচ: ৬৪
মোট গোল: ১৪৭
সর্বোচ্চ গোলদাতা: মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি), ৫ গোল
সেরা খেলোয়াড়: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: লুকাস পোডলস্কি (জার্মানি)
সেরা গোলরক্ষক: জিয়ানলুইজি বুফন (ইতালি)
ফরম্যাট:
২০০২ বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই খেলা হয় জার্মানির আসরে। ৩২ দল আট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলেছে একে অন্যের সঙ্গে। প্রত্যেক গ্রুপে থাকা ৪ দল নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার পর পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুই দল জায়গা করে নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে। এভাবে প্রত্যেক গ্রুপ থেকে আসা ২ দল নিয়ে নকআউট পর্ব শুরু হয় শেষ ষোলো দিয়ে। সেখানকার জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল হয়ে জায়গা করে নেয় ফাইনালে।
গ্রুপ পর্ব:
স্বাগতিক জার্মানি সব ম্যাচ জিতে ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে নাম লেখায় শেষ ষোলোতে, রানার্স-আপ হিসেবে যায় ইকুয়েডর। ‘বি’ গ্রুপ থেকে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড ও সুইডেন। ‘সি’ গ্রুপের কঠিন বাধা পেরিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা, আর রানার্স-আপ নেদারল্যান্ডস। ‘ডি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন পতুর্গাল, রানার্স-আপ মেক্সিকো। ‘ই’ গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে ওঠে ইতালি ও ঘানা। ‘এফ’ গ্রুপের সব ম্যাচে জয় পায় ব্রাজিল, শেষ ষোলোতে তাদের সঙ্গী হয় অস্ট্রেলিয়া। ‘জি’ গ্রুপে সুইজাল্যান্ডের পেছনে থেকে নকআউট পর্বে যায় ফ্রান্স। ‘এইচ’ গ্রুপে স্পেনের সঙ্গে বিশ্বকাপে টিকে থাকে ইউক্রেন।
শেষ ষোলো:
লুকাস পোডলস্কির জোড়া লক্ষ্যভেদে জার্মানি ২-০ গোলে হারায় সুইডেনকে। আর্জেন্টিনাকে অবশ্য দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। মেক্সিকোর বিপক্ষে তাদের ২-১ গোলের জয় আসে অতিরিক্ত সময়ে। ষষ্ঠ মিনিটে রাফায়েল মারকাসের লক্ষ্যভেদে এগিয়ে যায় মেক্সিকো, যদিও মিনিট চারেক পরই আলবিসেলেস্তেদের সমতায় ফেরান হের্নান ক্রেসপো। এই ১-১ সমতায় থেকেই শেষ হয় নির্ধারিত সময়। ফল নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের ৯৮ মিনিটে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন মাক্সি রোদ্রিগেস।
ডেডিভ বেকহামের দুর্দান্ত ফ্রি কিকে ইকুয়েডরকে ১-০ গোলে হারায় ইংল্যান্ড। নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করে দেয় পর্তুগাল একই ব্যবধানের জয়ে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইতালিকে দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। জার্মানির আসরে দাপট দেখানো সকারুরা ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রায়, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমের পেনাল্টি গোলে আজ্জুরিদের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেন ফ্রান্সেস্কো তত্তি।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল পায় দাপুটে জয়। ঘানাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় সেলেসাওরা। ফ্রান্স আবার ৩-১ গোলে হারায় স্পেনকে। আর গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ইউক্রেন ৩-০ গোলে হারায় সুইজারল্যান্ডকে।
কোয়ার্টার ফাইনাল:
কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দুই দলই। টাইব্রেকার ভাগ্যে শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। স্বাগতিক জার্মানির বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় তারা শেষ করেছিল ১-১ সমতায়। ৪৯ মিনিটে রবের্তো আয়ালার লক্ষ্যভেদে এগিয়ে গিয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু ৮০তম মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোসা জাল খুঁজে পেলে সমতায় ফেরে জার্মানরা। ১-১ গোলে নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়েও ফল থাকে একই। তাই ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে জার্মানি ৪-২ গোলের জয়ে নিশ্চিত করে সেমিফাইনাল। সেবারই বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার পেনাল্টি শুট আউটে হারের মুখ দেখে আজেন্টিনা।
ব্রাজিলকে বিদায় করে দেয় ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের হারায় ১-০ গোলে। ৫৭ মিনিটে ফ্রান্সের জয়সূচক গোলটি করেছেন থিয়েরি অঁরি। ইউক্রেনের বিপক্ষে ইতালি অবশ্য পায় সহজ জয়। লুকা তোনির জোড়া লক্ষ্যভেদে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ৩-০ গোলের জয়ে। পর্তুগালও সঙ্গী হয় তাদের। ইংল্যান্ডকে টাইব্রেকারে হারায় তারা ৩-১ গোলে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ছিল গোলশূন্য ড্র।
সেমিফাইনাল:
আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বিদায় নেওয়ায় ‘অল ইউরোপিয়ান’ সেমিফাইনালে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় জার্মানি-ইতালি ও পর্তুগাল-ফ্রান্স। মিউনিখের ম্যাচে ফ্রান্স ১-০ গোলের জয়ে পায় ফাইনালের টিকিট। ৩৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদ করে ফরাসিদের ফাইনালে তোলেন জিদান।
জার্মানি-ইতালি ম্যাচটি ছিল জমজমাট। আজ্জুরিরা ২-০ গোলে স্বাগতিকদের হারালেও প্রথম গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১১৯ মিনিট পর্যন্ত। ডর্টমুন্ডের ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত সময়ও শেষ হতে যাচ্ছিল গোলহীনভাবে, তবে ১১৯তম মিনিটে এসে জার্মানির গোলের দেয়াল ভাঙেন ফাবিও গ্রোসো। এরপর শেষ বাঁশি বাজার আগে জার্মানির কফিনে শেষ পেরেকটি মারেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম উত্তেজনা ছড়ানো ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স-ইতালি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে গড়ানো ম্যাচটি ৫-৩ ব্যবধানে জিতে চতুর্থ শিরোপা ঘরে তোলে ইতালি।
বার্লিনের ফাইনালের ম্যাচ জুড়ে ছিল দুটি নাম- জিনেদিন জিদান ও মার্কো মাতেরাজ্জি। দুজনই করেন লক্ষ্যভেদ, আবার দুজনই জড়ান বিতর্কে। মাতেরাজ্জির সঙ্গে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে জিদানের মাথা দিতে গুঁতা মারার ঘটনা কারও অজানা থাকার কথা নয়। আঘাতে মাটিতে পড়ে যান মাতেরাজ্জি, আর সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় জিদানকে।
জিদানের পেনাল্টি গোলে সপ্তম মিনিটে এগিয়ে গিয়েছিল ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়নরা স্পট কিকটি আবার পেয়েছিল মাতেরাজ্জির ভুলে। ইতালিয়ান ডিফেন্ডার প্রায়শ্চিত্ত করেন ১৯তম মিনিটে আজ্জুরিদের সমতায় ফিরিয়ে। আন্দ্রেয়া পিয়েরলোর কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে হেড থেকে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। এরপর দুদলই সুযোগ তৈরি করে অনেক, যদিও কাজে লাগাতে পারেনি। গোলে বেশি শট করার পরিসংখ্যানে ফ্রান্সই ছিল জয়ের দাবিদার। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে ১১০ মিনিটে মেজাজ হারিয়ে জিদান লাল কার্ড দেখলে বিশ্বকাপ হাত ফসকে যায় ফ্রান্সের কাছ থেকে।
১১০ মিনিটে লাল কার্ড দেখে জিদান মাঠ ছাড়ার পরও ১-১ সমতায় রেখে অতিরিক্ত সময় শেষ করে ফ্রান্স। কিন্তু টাইব্রেকারে আর পারেনি ইতালির বিপক্ষে। আজ্জুরিদের নেওয়া পাঁচ স্পট কিকের সবই জালে জড়ান তাদের খেলোয়াড়রা। বিপরীতে ফ্রান্সের নেওয়া দ্বিতীয় স্পট কিকটি মিস করেন দাভিদ ত্রেজেগে। যাতে ফ্রান্সের হয় স্বপ্নভঙ্গ, বিপরীতে ইতালি মাতে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে।