আমি কোনও ‘সিন্ডিকেট’ করিনি: অস্কার ব্রুজন

ঘরোয়া ফুটবলে টানা সাফল্য এনে দিয়ে কোচের ক্লাব ছাড়ার নজির বাংলাদেশের ফুটবলে কমই আছে! অস্কার ব্রুজন হলেন তেমন একজন। ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে তিনি বসুন্ধরা কিংসে যোগ দেন। প্রায় ৬ বছর কাজ করে এখন কোচের পদ থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়েছে তাকে!

২০১৮-২০১৯ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক বসুন্ধরা কিংসের। স্প্যানিশ কোচের অধীনে দলটি প্রিমিয়ার লিগে পাঁচটি, ফেডারেশন কাপ দুটি ও স্বাধীনতা কাপে একটি ট্রফি জিতেছে। শেষ মৌসুমে তো ট্রেবলও এসেছে। তারপরও নানান কারণে ব্রুজনকে কিংস ছাড়তে হয়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে ৪৭ বছর বয়সী কোচকে টানা ৬ বছর রেখে দেওয়ার পর তার সঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এনিয়ে ব্রুজন বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নানান কথা তুলে ধরেছেন...

বাংলা ট্রিবিউন: টানা ৬ বছর কাজ করেছেন। ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্য আছে। কেন কোচের দায়িত্বে আর থাকলেন না?

অস্কার ব্রুজন: আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর থাকবো না। এই সিদ্ধান্ত তো আমার। শেষ ৬ বছরে জয় ছাড়া কিছুই ছিল না। সেই সঙ্গে দলের উন্নতিও হয়েছে। এছাড়া দলের ম্যানেজারের (ওয়াসিমুজ্জামান) সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না।

ম্যানেজারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণ কী?

ব্রুজন: আমি একই সঙ্গে ক্লাবে অন্য কিছু চলতে দিতে পারি না। ক্লাবে পরিচালনার জন্য তার প্যারালাল সংগঠনের সঙ্গে একমত নই। সব বিদেশি খেলোয়াড় তার ওপর হতাশ। এটাও ক্লাব ছাড়ার অন্যতম কারণ।

আপনি ক্লাব সভাপতির সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেছেন?

ব্রুজন: হ্যাঁ, আমি সবকিছুই শেয়ার করেছি। বলেছি টিম ম্যানেজারের প্যারালাল সংগঠন চালানোর বিষয়টা আমি মেনে নিতে পারছি না। এটা ক্লাবের জন্য মোটেও ভালো নয়।

ক্লাব ম্যানেজার আসলে কী করেছেন?

ব্রুজন: এজেন্ট ব্যবসা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। আসলে সে ফুটবল সম্পর্কে কিছুই জানে না। কোনও অভিজ্ঞতাও নেই। সে (ওয়াসিমুজ্জামান) হলো প্যারালাল সংগঠনের প্রধান! সে একাই যথেষ্ঠ। বাকিদের কথা আর বলার প্রয়োজন পড়ছে না।

brujon-kings

সভাপতিকে খুলে বলার পর কী হলো?

ব্রুজন: সভাপতি অবগত আছেন। সব জানেন। তিনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তাহলে আপনি যাচ্ছেন কেন?

ব্রুজন: আমি আগেই বলেছি কেন আমি ক্লাব ছেড়েছি। আমার সঙ্গে সভাপতির সম্পর্ক খুব আন্তরিক ও ভালো। এছাড়া আরও একটি কারণ আছে। আমার সাত মাস বয়সী সন্তান আছে স্পেনে। তাকে ও পরিবারকে সময় দিতে হবে।

কিন্তু আমরা শুনেছি আপনি ক্লাবের মধ্যে অন্য বলয় (সিন্ডিকেট) তৈরি করেছেন?

ব্রুজন: না না, এটা ঠিক নয়। আসলে এই কাজটি করেছে ক্লাবের ম্যানেজার নিজে।

তাহলে আপনি কোনও ক্লাবের মধ্যে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করেননি?

ব্রুজন: হা হা (হাসি)। কে বলেছে আপনাকে এসব কথা। ব্যবসায়িক দিক দিয়ে হতে পারে, তবে ক্লাবের স্বার্থে নয়। আসলে এটাই সমস্যা। দেখেন... আমি কোভিডের সময় আমার বেতন অর্ধেক নিয়েছি, শুধু ক্লাবকে সাহায্য করার জন্য। আমি ম্যানেজারের অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য কিছু এজেন্টদের অনুগ্রহ সম্পর্কে অভিযোগ করেছি।

আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলে কাজ করেছি। কোনও পারিশ্রমিক নেইনি। শুধু কোচিংয়ের স্বার্থে কাজ করেছি। 

এছাড়া আমি আগেই চুক্তি বাতিল করেছি। একমাসের বেতনও নেইনি। (ক্লাব প্রসঙ্গে বলছিলেন)। 

আর আপনি কিসের সিন্ডিকেটের কথা বলছেন বুঝতে পারছি না!

সিন্ডিকেট বলতে সবকিছুই নিজের মতো করা। নিজের বলয় তৈরি করা বোঝাতে চাইছি। শোনা যায়, এতে নাকি খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছুটা বিভাজনও হয়েছে?

ব্রুজন: যা করেছি জয়ের জন্য। কোনও ব্যবসার জন্য নয়। অন্যদের মতো নয়। যার কারণে তারা বারবারই আমাকে অভিযুক্ত করে আসছিল। কারণ আমি অন্য কোনও স্বার্থে প্যারালাল কোনও কিছু হতে দিতে চাইতাম না। তাদের স্বার্থ দেখতাম না।

আপনি তো সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশ সরব। সমর্থক থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে নানান কথায় জড়িয়ে যেতেন।

ব্রুজন: ফেসবুকে যারা আছে, তারা তো এজেন্ট দিয়ে চলে। সব গ্রুপেরই বেলায় কথাটি প্রযোজ্য। আর এটাও সত্য তারা আমাকে দেখতে পারতো না। কারণ তারা আমাকে প্রভাবিতও করতে পারতো না।

brujon-kings2

ঠিক আছে বুঝলাম। আপনি সব জায়গায় ব্যক্তিগতভাবে সবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন, কেন?

ব্রুজন: আমি কী বলবো। আমি তো সোশ্যাল মিডিয়াতে সক্রিয় নই। এটাও তাদের (প্রতিপক্ষ) কথা মনে হয়। আমার মনে হয় আপনি তাদের কথা বিশ্বাস করছেন।

তা হবে কেন। আমি শুধু আপনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ বা অনুযোগ আছে, তার ব্যাখ্যা জানতে চাইছি। আপনি ঘরোয়া ফুটবলে সফল। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যর্থ কেন?

ব্রুজন: ব্যর্থ কেন বলছেন। সবসময় রানার্সআপ হয়েছি। এটাও তাদের কথা বলে মনে হচ্ছে! দেখুন প্রতিপক্ষ দল আমাদের চেয়ে ৫-৬ গুণ বাজেটের দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ১৮৫। তারপরও আমরা এএফসি কাপে ভালো করেছি। তারা নিজেদের পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। তবে তারা উল্টোটি দেখানোর চেষ্টা করে।

আপনি এই কথা বলছেন। বাংলাদেশ থেকে আবাহনী লিমিটেড এএফসি কাপের জোনাল সেমিফাইনালে খেলেছে। উত্তর কোরিয়ার এফসি টোয়েন্টি ফাইভকে ঢাকায় হারিয়েছিল। তাহলে কিংস জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও উঁচুমানের বিদেশি নিয়ে শক্তিশালী দল হয়ে কেন নক আউটে যেতে পারেনি?

ব্রুজন: সেটা আমি অনেক আগেই বলেছি। এখন আর নতুন করে বলতে চাইছি না। আমার গত বছরের কথাগুলো চেক করলে উত্তর পাবেন।

ও হ্যাঁ, আপনার নিউজ (বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত) দেখেছি। আমাকে নিয়ে যা লিখেছেন (গতকাল)। শুধুই বলবো এটা দুর্ভাগ্যজনক। যে কারণে আমি আমার পক্ষ থেকে সব রকমের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

গুঞ্জন আছে কিংসের পর আপনি যে কোনও সময় বাংলাদেশ জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে পারেন।

ব্রুজন: আমি আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবো। সময়মতো যোগাযোগ হবে।

এই বলে আর ব্রুজন আর কথা বাড়াতে চাননি।