‘বরখাস্তের সঙ্গে ৭ মাসের বকেয়া পেলে ভালো হতো’

প্রবাদ আছে—সাফল্য থাকলে সবাই পাশে থাকে, আর ব্যর্থতায় সবাই সরে যায়। কোচ আলফাজ আহমেদের  ক্ষেত্রে যেন সেটিই বাস্তব হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিংকে তিনি প্রথমবারের মতো পেশাদার লিগের শিরোপা এনে দিয়েছেন, জিতেছেন ফেডারেশন কাপও। তার অধীনে দল কয়েকবার ফাইনালেও উঠেছে।

কিন্তু ফুটবলের নির্মম বাস্তবতা—গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন করা দলটি এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ধুঁকছে। ১০ দলের লিগে ১১ পয়েন্ট নিয়ে সাত নম্বরে অবস্থান করছে তারা। সেই ব্যর্থতার দায় গিয়ে পড়েছে কোচের কাঁধেই। ফল—হঠাৎ করেই বরখাস্ত হতে হয়েছে।

বরখাস্তের পর নিজের অভিজ্ঞতা, আক্ষেপ ও বাস্তবতা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক এই স্ট্রাইকার।

প্রশ্ন: কখনও কি ভেবেছিলেন এভাবে হঠাৎ বিদায় নিতে হবে?
আলফাজ: না, ভাবিনি। তবে কোচিং শুরু করার পর থেকেই জানতাম—ভালো করলে থাকবো, খারাপ করলে যেতে হবে। কোচদের পেশার এটাই বাস্তবতা।

প্রশ্ন: কখন জানতে পারলেন আপনার চাকরি আর নেই?
আলফাজ: কিছুদিন ধরেই ফিসফাস শুনছিলাম। আবাহনী লিমিটেডের কাছে হারের পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। অনুশীলন শেষে হোয়াটসঅ্যাপে অব্যাহতির চিঠি পাই।

প্রশ্ন: নিয়ে ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে?
আলফাজ: না, কোনো কথা হয়নি। আমিও বলিনি, তারাও বলেনি।

প্রশ্ন: লিগে খারাপ অবস্থানের দায় কি পুরোপুরি আপনার?
আলফাজ: কোচ হিসেবে ব্যর্থতার দায় অবশ্যই আমার। কিন্তু দল কী পরিস্থিতিতে খেলছে, কাদের নিয়ে খেলছে—সেগুলো বিবেচনায় নিলে পুরো দায় একা আমার নয়।

প্রশ্ন: একটু বিস্তারিত বলবেন?
আলফাজ: এই মৌসুমে মোহামেডানের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে। গতবারের দল ধরে রাখা যায়নি। দিয়াবাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় চলে গেছে। বিদেশি নিয়োগও আগের মতো হয়নি। উপরন্তু বেতন বকেয়া ছিল। খেলোয়াড়রা একাধিকবার অনুশীলন বয়কট করেছে। তাদের বুঝিয়ে মাঠে আনতে হয়েছে। ক্লাবজুড়ে ছিল অস্থিরতা। সব মিলিয়ে সময়টা ভালো যায়নি। এই পরিস্থিতিতে আগের মতো পারফরম্যান্স করা কঠিন ছিল। তারপরও চেষ্টা করেছি।

শিষ্যদের সঙ্গে কোচ আলফাজ।প্রশ্ন: আর্থিক সংকট তো নতুন কিছু নয়। তবু এমন ফল কেন?
আলফাজ: শুরু থেকেই ক্লাব সংকটে ছিল। নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেয় দলবদলের চার মাস পর। লিগ শিরোপা ধরে রাখতে যেভাবে দল গড়া দরকার ছিল, তা হয়নি। উল্টো গড়ে তোলা দল ভেঙে গেছে। স্থানীয় খেলোয়াড়রা পেয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ বেতন, বিদেশিদেরও বকেয়া আছে। এ অবস্থায় সেরাটা পাওয়া কঠিন।

প্রশ্ন: দিয়াবাতে না থাকাটা কতটা প্রভাব ফেলেছে?
আলফাজ: অনেকটাই। দিয়াবাতে এমন একজন খেলোয়াড়, যে একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। গত মৌসুমের শিরোপা জয়ে অবদান রাখা অনেকেই এবার দলে ছিল না। বিদেশিদের মধ্যে মোজাফফরভ ছাড়া কেউ ভালো খেলেনি। স্যামুয়েল বোয়েটাং গত মৌসুমে রহমতগঞ্জের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করলেও এখানে এসে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। সব মিলিয়ে দল ভালো করেনি।

প্রশ্ন: এত সাফল্যের পর হঠাৎ এমন বিদায়কীভাবে দেখছেন?
আলফাজ: কোচদের জীবন এমনই—ভালো করলে থাকবেন, না হলে বিদায়। তবে কষ্টটা অন্য জায়গায়। এত সাফল্যের পর বিদায়টা আরও সম্মানজনক হতে পারত। আলোচনা হতে পারত, মতামত নেওয়া যেত। কিন্তু কিছুই হয়নি।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়—এখনও সাত মাসের বেতন বাকি! বরখাস্তের নোটিসের সঙ্গে যদি বকেয়া পরিশোধ করা হতো, তাহলে খারাপটা কম লাগতো। চিঠিতেও উল্লেখ নেই কবে, কীভাবে এই টাকা পাবো। আশা করি, ক্লাব কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করবে।

প্রশ্ন: অভিযোগ আছে, নিজের পছন্দের বাইরে কাউকে খেলান নাএটা কি সত্য?
আলফাজ: এটা হাস্যকর অভিযোগ। কোনো কোচ কি ভালো খেলোয়াড়কে বসিয়ে খারাপ খেলোয়াড় খেলায়? এমন একজনের নাম বলুন, যাকে বসিয়ে রেখে দুর্বল কাউকে খেলিয়েছি! কেউ অভিযোগ করলে ক্লাব কর্তারা আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

প্রশ্ন: বরখাস্তের পর মোজাফফরভ আপনার প্রশংসা করেছেন
আলফাজ: সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। হয়তো আমার কাজ তার ভালো লেগেছে।

প্রশ্ন: এখন পরিকল্পনা কী?
আলফাজ: হঠাৎ কোচিংয়ের বাইরে গেলে যা হয়। নতুন করে ভাবতে হবে। আগে সারাদিন ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এখন চাপমুক্ত। কিছুদিন মুক্তভাবে থাকবো, তারপর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবো।

প্রশ্ন: মোহামেডানের জন্য কোনো বার্তা?
আলফাজ: অবশ্যই। দল যেন ভালো অবস্থায় ফিরে আসে। খেলোয়াড়রা যেন বকেয়া বেতন পায়। আগের সমস্যাগুলো দূর হোক। দল ঘুরে দাঁড়াক—এটাই কামনা।