অতি-রক্ষণাত্মক নীতিই কাল হলো ইংল্যান্ডের, হারের দায় কাঁধে নিলেন টুখেল 

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। ফাইনালের টিকিট তখন থ্রি লায়ন্সদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তায় ৮৫ ও ৯২ মিনিটে গোল হজম করে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। এই হার্ডব্রেকিং বিদায়ের পর ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ থমাস টুখেলের রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বইছে সমালোচনার ঝড়। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে রীতিমতো তোপের মুখে পড়েছেন তিনি, তবে হারের সমস্ত দায় নিজের কাঁধে নিলেও নিজের সিদ্ধান্তের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই এই কোচের। 

ম্যাচের ৫৫ মিনিটে মরগান রজার্সের চমৎকার ক্রস থেকে নিখুঁত এক ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডকে লিড এনে দিয়েছিলেন অ্যান্থনি গর্ডন। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন ইংল্যান্ডের হাতে। কিন্তু গোল পাওয়ার পরই অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেন টুখেল। আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্র গর্ডনকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে তিনি ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে নামিয়ে রক্ষণভাগকে ‘ব্যাক ফাইভ’ (পাঁচজনের ডিফেন্স)-এ রূপান্তর করেন।

এখানেই শেষ নয়, আর্জেন্টিনার জোড়া গোলের ঠিক আগে তিনি রক্ষণকে আরও ভারী করতে ড্যান বার্ন এবং নিকো ও’রাইলিকেও মাঠে নামান। কিন্তু টুখেলের এই অতি-রক্ষণাত্মক ‘জুয়া’ হিতে বিপরীত হয়। ইংলিশরা রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সেই সুযোগে একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজের গোলে ম্যাচটি নিজেদের করে নেয় আর্জেন্টিনা। 

বদলি খেলোয়াড় নামানোর এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে টুখেল নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “আমরা পাঁচজনের রক্ষণভাগ নিয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কারণ মাঠের ফাঁকা জায়গাগুলো বড্ড বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। গোল পাওয়ার পরপরই— কোনও খেলোয়াড় বদল করার আগেই— আমরা প্রচুর ক্রস এবং একের পর এক গোল করার সুযোগ দিচ্ছিলাম। তারা প্রতিটি হেডার জিতছিল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা ভেতরে জায়গা বন্ধ করার জন্য এবং বাতাসে বলের দখল বাড়াতে পাঁচজনের রক্ষণভাগে চলে যাই। আমরা খেলোয়াড়দের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলাম। তবে অবশ্যই সমস্ত দায়িত্ব কোচের ওপরই বর্তায়। আর যদি ফল ভালো না আসে, তবে সেটাকে ভুল বলা খুব সহজ।” 

এর আগে বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টুখেল সরাসরি বলেন, মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা তারই এবং এই বিদায়ের পেছনে কোনও আফসোস নেই তার।

“আপনি এই বিষয়টি নিয়ে লাখো কোচের সাথে আলোচনা করতে পারেন, কিন্তু মাঠে সিদ্ধান্তটি আমাকেই নিতে হয়। আমি ম্যাচটি বিশ্লেষণ করেছি এবং একটি নির্দিষ্ট উপায়ে তা পরিচালনা করেছি, তাই এর দায় সম্পূর্ণ আমার। এই মুহূর্তে আমার কোনও অনুশোচনা নেই। দল তাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল এবং আমরা জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম,” বলেন টুখেল।

প্রতিপক্ষের শক্তির কথা বিবেচনা করে এই ম্যাচকে টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দাবি করে তিনি বলেন, “পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে সম্ভবত এটাই আমাদের সেরা ম্যাচ ছিল। দল দারুণ খেলেছে, আমরা কেবল শেষ রেখাটা পার হতে পারিনি। বড় বড় ফুটবল পরাশক্তি সেমিফাইনালের আগেই বাদ পড়ে গেছে, তাই এই মঞ্চে ওঠাটাই একটা বড় অর্জন।”

সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ডের কোচ হিসেবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে বিদায়ের গুঞ্জন উড়িয়ে দেন এই জার্মান মাস্টারমাইন্ড। তিনি মনে করিয়ে দেন, বিশ্বকাপে এখনও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী (ব্রোঞ্জ মেডেল) ম্যাচ খেলা বাকি আছে।

টুখেল বলেন, “এখনও আরেকটি ম্যাচ খেলা বাকি আছে। আমরা হয়তো ম্যাচটি খেলার জন্য খুব একটা মুখিয়ে নেই, তবে ২০২৮ সালের ঘরের মাঠের ইউরো পর্যন্ত আমাদের চুক্তি রয়েছে। আমি সেটার দিকেই তাকিয়ে আছি, যদিও এই মুহূর্তে এত দূরের কথা ভাবাটা বেশ কঠিন।”

গ্রুপ পর্বের কঠিন প্রতিপক্ষ, দীর্ঘ ভ্রমণ, অতিরিক্ত উচ্চতা (অ্যালটিটিউড), ১০ জন নিয়ে খেলা এবং প্রচণ্ড গরমের মতো একের পর এক বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে আসার জন্য দলের মানসিকতা ও ঐক্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, টুখেলের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতাই ইংল্যান্ডের নিশ্চিত ফাইনালের স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।