২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আবারও বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসিদের টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তোলার নেপথ্য নায়ক আলবিসেলেস্তেদের ৪৮ বছর বয়সী মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি। থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে নাটকীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ জয়ের পর ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না এই সফল কোচ। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে জানালেন দল নিয়ে তার গর্বের কথা, মাতলেন শিষ্যদের প্রশংসায়।
বিলম্বিত এই সংবাদ সম্মেলনে স্ক্যালোনি অকপটে স্বীকার করেন, এই দলের লড়াকু মানসিকতা দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
জাতীয় সিনিয়র দলের হয়ে ইতোমধ্যে চারটি মেজর শিরোপা (কোপা আমেরিকা ২০২১ ও ২০২৪, ফিনালিসিমা ২০২২ এবং ২০২২ বিশ্বকাপ) জেতা এই কোচ দলের ফুটবলারদের নিবেদন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দেশ, আমাদের মানুষের জন্য এটি এক বিশাল আনন্দ। সেদিনই আমি বলেছিলাম যে এই দলটি আমাকে অবাক করা কখনোই বন্ধ করে না। আজ আমার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠছে কারণ এই পারফরম্যান্স দলগত কাজ, ভ্রাতৃত্ববোধ, কখনও হাল না ছাড়া এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার এক অনন্য নিদর্শন।”
ফাইনালে ট্রফি ধরে রাখার লড়াই প্রসঙ্গে স্ক্যালোনি যোগ করেন, “আমরা ফাইনালে জিততে যাচ্ছি, কিন্তু এই দলের আর কী-ই বা করার আছে? তারা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। এর সব কৃতিত্বই খেলোয়াড়দের। আমরা জেতার চেষ্টা করবো, আমাদের সবকিছু উজাড় করে দেবো। তবে খেলোয়াড়রা মাঠে যা প্রদর্শন করছে তা সাধারণ মানুষকে বোঝানো খুব কঠিন। আমরা অনন্য, এবং এটি কোনও অহংকার নয়। এই মানুষগুলোই আমাদের বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছে।”
আর্জেন্টাইন জার্সির প্রতি খেলোয়াড়দের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করে স্ক্যালোনি বলেন, “এই জার্সি দাবি করে শেষ পর্যন্ত সবকিছু উজাড় করে দেওয়া, কোনও কিছু জমিয়ে না রাখা। ফুটবলাররা আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা দেশের জন্য কতটা গভীরভাবে অনুভব করে।”
তার ভাষায়, “তাদের কেউই এই দায়িত্বের বোঝায় কাবু নয়; তারা একদম সত্যিকারের যোদ্ধার মতো। আপনি যখন তাদের এই পারফরম্যান্স দেখবেন— মনে হবে তারা যেন ৭ বা ৮ বছরের শিশুর মতো খেলছে; তারা শুধু ফুটবল খেলার কথাই ভাবে।”
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-১ ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে কোচ বলেন, এই দলটি চাপের মুখে নিজেদের সেরা খেলাটি খেলতে জানে।
টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলোর তুলনা করতে গিয়ে স্ক্যালোনি বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম শেষ ১৬-তে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটিই আমাদের সেরা ছিল, কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই সেমিফাইনাল তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, এটি একটি সেমিফাইনাল। আমি জানি না আগে কখনও এমনটি ঘটেছে কিনা। আমার মনে হয় দিয়েগোর (ম্যারাডোনা) ঐতিহাসিক সেই দ্বিতীয় গোলটি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে, তবে সামগ্রিক খেলার মানের দিক থেকে আজকের ম্যাচটি ছিল অবিশ্বাস্য।”
বাঙ্গালদেশ সময় আগামী সোমবার রাত ১টার ফাইনালে ইউরোপিয়ান পরাশক্তি স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। ফাইনাল নিয়ে স্ক্যালোনি বলেন, “স্পেন একটি দুর্দান্ত দল এবং তারা ফ্রান্সকে খুব ভালোভাবে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে। আমরা ইতোমধ্যে গত মার্চেই তাদের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করেছি। সবাই জানে তারা কেমন খেলে। আমরা তাদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে স্ক্যালোনির মূল দর্শন জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেন, “আমরা জিতলাম কি জিতলাম না, তার ওপর আমাদের সাফল্য নির্ভর করে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা পরিস্থিতির মোকাবিলা কীভাবে করছি। আমার মূল চিন্তা হলো ছেলেরা যেন ভালো শারীরিক অবস্থায় (ফিটনেস) মাঠে নামে। সামনে যা আসছে, তা মোকাবিলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত।”









