২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়ে শিরোপা হারানোর হতাশা সংবরণ করতে না পেরে মাঠেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকজন শীর্ষ তারকা ও কোচিং স্টাফের বিরুদ্ধে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফিফা তাদের ডিসিপ্লিনারি অ্যান্ড এথিকস প্রসেকিউটরকে (অনুশাসন ও নীতিবিষয়ক প্রসিকিউটর) ঘটনার বিশদ তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত আর্জেন্টাইন ফুটবলার ও কোচদের বৈশ্বিক ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এএফএ) বড় অঙ্কের জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্প্যানিশ ফুটবলাররা উল্লাসে মেতে ওঠেন। ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি বেঞ্চ থেকে দৌড়ে সতীর্থদের সঙ্গে যোগ দিতে যাওয়ার সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা তার পেটে বা বাহুতে চড়-ঘুষি মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। এটিই মূলত ঘটনার সূত্রপাত ঘটায়।
রদ্রি প্রতিবাদ জানালে মলিনা ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস উগ্রভাবে তেড়ে আসেন। স্পেনের এরিক গার্সিয়া সতীর্থকে বাঁচাতে এলে পারেদেস তার গলা চেপে ধরেন। গাবি পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে তাকে মাটিতে ফেলে দেন থিয়াগো আলমাদা এবং পারেদেস তার মুখে হাত দিয়ে ধাক্কা দেন। এমনকি আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাও এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন এবং স্প্যানিশ মিডফিল্ডার দানি ওলমোকে আঘাত করেন বলে ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে।
বিবিসি স্পোর্টসের সরাসরি সম্প্রচারে সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার বলেন, “পারেদেস একজনের মুখে দুই-তিনটি ঘুষি মেরেছে। সে স্পষ্টভাবে আক্রমণের জন্য গিয়েছিল। ফুটবল মাঠে এসবের কোনও জায়গা নেই। হারের কষ্ট আমরা বুঝি, কিন্তু হার মেনে নেওয়ারও একটা ভদ্রতা থাকে।” অপরদিকে সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক জো হার্ট এই আচরণকে ‘অরুচিকর’ বলে অভিহিত করেছেন।
ফিফা ও অনুশাসন ধারা (আর্টিকেল ১৩)
ফিফার শৃঙ্খলামূলক কোডের ১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘ফুটবল খেলা বা ফিফাকে হেয় করা’ এবং ‘শালীন আচরণের মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন করার’ অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ক্লাবসংশ্লিষ্ট ফুটবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে।
এর আগে ২০১৩ সালে সুয়ারেজের কামড় কিংবা ২০২৩ সালে স্প্যানিশ এফএ সভাপতি রুবিয়ালেসের ঘটনার মতোই এবারও কঠোর নীতি অবলম্বন করতে পারে সংস্থাটি।
পুরোনো বিতর্কের কালো ছায়া
আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়।
১. ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্যানার বিতর্ক: এর আগে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, জিওভানি লো সেলসো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজ একটি ব্যানার তুলে ধরেছিলেন যেখানে লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ (ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার)। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের দায়ে ইতোমধ্যেই এএফএ শাস্তির মুখে রয়েছে।
২. ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা: ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও ড্রেসিংরুমে এমবাপ্পেকে নিয়ে উপহাস, ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পর এনজো ফার্নান্দেজের বর্ণবাদী গান এবং সম্প্রতি মার্তিনেজের ক্যামেরা ভাঙার ঘটনায় আর্জেন্টিনা ফুটবল দল বারবার সমালোচিত হয়েছে।
যদিও আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি ম্যাচ শেষে বিষয়টিকে হালকা করার চেষ্টা করে বলেছেন, “আমরা যেমন জয়ে মার্জিত, তেমনি পরাজয়েও আমাদের মার্জিত হওয়া উচিত। আমরা হেরেছি এবং তা মেনে নিয়েছি।”
তবে ফিফার ডিসিপ্লিনারি প্রসেকিউটর ঘটনাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন। তদন্ত সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় লাগলেও, নতুন মৌসুম শুরুর আগেই আর্জেন্টাইন তারকাদের ওপর শাস্তির খড়গ নেমে আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি