ফুটবলের মহারণে আর্জেন্টিনার নামের পাশে কেন বারবার বিতর্ক?

ফুটবল আবেগের খেলা। জয়-পরাজয়ের তীব্রতা অনেক সময় খেলোয়াড়দের সংযমের সীমাও পরীক্ষা নেয়। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই আবেগ যখন হাতাহাতি, প্রতিপক্ষকে অপমান কিংবা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অসৌজন্যতার রূপ নেয়, তখন তা কেবল একটি ম্যাচের গল্প হয়ে থাকে না—পরিণত হয় আলোচনার বিষয়ে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মাঠে সংঘর্ষ এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রতিপক্ষের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর লেয়াদ্রো পারেদেসসহ কয়েকজন ফুটবলারের আচরণ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ফিফা। ঘটনাটি নতুন হলেও, ইতিহাস বলছে এমন বিতর্কে এর আগেও একাধিকবার জড়িয়েছে আলবিসেলেস্তেরা।

১৯৯০: বিশ্বকাপ ফাইনালের তিক্ত সমাপ্তি

আর্জেন্টিনার বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনাল। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল হওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। রেফারি এডগার্দো কোদেসালকে ঘিরে ধাক্কাধাক্কি করেন তারা।

এর আগে গুস্তাভো দেজোত্তি লাল কার্ড দেখায় ৯ জন নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ম্যাচ শেষে দিয়েগো ম্যারাডোনাও প্রকাশ্যে রেফারির সমালোচনা করেন। পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় এমন আচরণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে আছে।

২০০৬: বিদায়ের পর হাতাহাতি

জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হারের পরও শান্ত হয়নি পরিস্থিতি। শেষ বাঁশি বাজার পরপরই দুই দলের খেলোয়াড় ও স্টাফদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়।

অদ্ভুত এক ঘটনায়, ম্যাচে এক মিনিটও না খেলেও বেঞ্চে থাকা লেয়াদ্রো কুফরে হাতাহাতিতে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখেন। ম্যাচ-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার কারণে সেই ঘটনা দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল।

২০১৯: মেসির অভিযোগ, পদক না নেওয়ার সিদ্ধান্ত

কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হারের পর লিওনেল মেসি অভিযোগ করেছিলেন, টুর্নামেন্ট ব্রাজিলকে জেতানোর জন্যই সাজানো হয়েছে।
এরপর চিলির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গ্যারি মেডেলের সঙ্গে সংঘর্ষে লাল কার্ড দেখেন তিনি। ম্যাচ শেষে ব্রোঞ্জ পদক গ্রহণও করেননি মেসি। আয়োজকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বর্জনের সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

২০২২: জয়ের পরও বিতর্ক

কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উত্তপ্ত ম্যাচটি শেষ হলেও উত্তেজনা থামেনি। টাইব্রেকারে জয়ের পর কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার পরাজিত ডাচ খেলোয়াড়দের সামনে গিয়ে উল্লাস করেন। ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসিও প্রতিপক্ষ কোচ লুই ফন হাল এবং স্ট্রাইকার ভাউট ভেগহর্স্টের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান।

পরে দুই দলের বিরুদ্ধেই শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে তদন্ত শুরু করেছিল ফিফা। তবে সেটি পরাজয়ের নয়, জয়ের পর প্রতিপক্ষকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ ছিল।

২০২৪: উদযাপন নিয়েও সমালোচনা

কোপা আমেরিকা জয়ের আনন্দও বিতর্কমুক্ত থাকেনি। কলম্বিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে কলম্বিয়ার খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বর্ণবাদী ও অপমানজনক গান গাইতে দেখা যায়।

ঘটনাটি নিয়ে ফিফা এবং কলম্বিয়া ফুটবল ফেডারেশন উভয়ই প্রতিবাদ জানায়। জয় উদযাপনের মধ্যেও এমন আচরণ নতুন করে প্রশ্ন তোলে আর্জেন্টিনা দলের ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা নিয়ে।

সব হারেই অবশ্য এমন হয়নি

অবশ্য প্রতিটি বড় পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনা বিতর্কে জড়িয়েছে— এমনও নয়।
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, কিংবা ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়ের পর দলের হতাশা, কান্না ও বেদনার ছবি দেখা গেছে। কিন্তু মাঠে সংঘর্ষ বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগ ওঠেনি। ২০১৬ সালে টানা হতাশার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সাময়িক অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি।

অন্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে তুলনা

বিশ্বকাপজয়ী দলগুলোর ইতিহাসে আবেগঘন মুহূর্ত কিংবা উত্তপ্ত ম্যাচের অভাব নেই। ইতালির কিছু বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে আর্জেন্টিনার তুলনা টানা হলেও, বড় নকআউট ম্যাচের পর বারবার সংঘর্ষ, প্রতিপক্ষকে উত্ত্যক্ত করা বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিতর্কে জড়ানোর মতো ধারাবাহিক উদাহরণ খুব বেশি দেখা যায় না।

২০২৬ সালের ফাইনালের পর ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা সেই পুরোনো বিতর্কগুলোকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। এবার ফিফার তদন্ত শেষে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।