বিশ্বকাপ জয়ের পরও স্পেনের ফুটবল দর্শন নিয়ে চলছে আলোচনা। অনেকে এখনও তাদের খেলার ধরনকে 'টিকি-টাকা'র তকমা দিয়ে থাকেন। তবে দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেই পরিচয় মানতে নারাজ। তার দাবি, আধুনিক স্পেনের ফুটবল 'টিকি-টাকা' নয়, বরং এটি একটি বিবর্তিত পজেশনভিত্তিক ফুটবল। যেখানে বলের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গতি, ট্রানজিশন এবং কার্যকারিতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপ জয়ের পর স্প্যানিশ দৈনিক এএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ তার দলের কৌশলগত পরিচয়, সাফল্যের রহস্য এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনকে বিশ্বের অন্যতম সফল জাতীয় দলে পরিণত করার দর্শন নিয়ে কথা বলেন।
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন অপরাজিত থেকেই বিশ্বকাপ জিতেছে। পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে এবং একই সঙ্গে টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড ৩৮ ম্যাচে উন্নীত করেছে। তবে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের স্বর্ণযুগের স্পেনের সঙ্গে তুলনা করা হলেও, নিজের দলকে সেই পুরোনো 'টিকি-টাকা' পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি।
‘টিকি-টাকা’ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ‘গত ১৬ বছরে ফুটবল অনেক বদলে গেছে।’ তার ভাষায়, ‘আমাদের মূল দর্শন একই আছে, তবে সেটিও সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। টিকি-টাকার মতো প্রচলিত শব্দ আমি খুব একটা পছন্দ করি না। মানুষ কেন এটি ব্যবহার করে, সেটা বুঝি। কিন্তু আমার কাছে পজেশনভিত্তিক ফুটবল কথাটি অনেক বেশি উপযুক্ত। অনেক সময় টিকি-টাকা শব্দটির মধ্যে নেতিবাচক ইঙ্গিতও থাকে।’
স্পেনের বল দখলনির্ভর ফুটবল বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় তাদের স্বর্ণযুগে। ইউরো ২০০৮, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ইউরো ২০১২ জয়ের পথে অবিশ্বাস্য বলের নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত পাসিংয়ের মাধ্যমে তারা বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে এই দর্শনের ভিত্তি গড়ে ওঠে বার্সেলোনায় ইয়োহান ক্রুইফের বিপ্লবী ধারণার ওপর, যা ডাচ 'টোটাল ফুটবল' থেকে অনুপ্রাণিত ছিল। পরে পেপ গার্দিওলা সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।
সময়ের সঙ্গে সমালোচকরা বলতে শুরু করেন, স্পেনের অতিরিক্ত বল দখলনির্ভর ফুটবল একঘেয়ে ও সহজে অনুমেয় হয়ে পড়েছে। তবে দে লা ফুয়েন্তের বিশ্বাস, আধুনিক স্পেন সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছে। এখন তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই গতি ও সরাসরি আক্রমণকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তার কথায়, ‘ফুটবল সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্ট নতুন কিছু শেখায়। ইউরোতেই আমরা উইঙ্গারদের ব্যবহার শুরু করার পর খেলার ধরণে পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। এখন ট্রানজিশন আর গতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগে একটা ধারণা ছিল—যে দল বেশি সময় বল দখলে রাখবে, তার জয়ের সম্ভাবনাও বেশি থাকবে। এখন আর সেটা সত্য নয়। কোনো দল মাত্র ৩০ শতাংশ বলের দখল রেখেও আপনাকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দিতে পারে।’
শুধু বল দখলে রাখার জন্য নয়, বরং কার্যকর ফুটবল খেলতেই মনোযোগী স্পেন। বিশ্বকাপে তারা যেমন পাসিং ও গোলের সুযোগ তৈরিতে শীর্ষ দলগুলোর একটি ছিল, তেমনি রক্ষণেও ছিল অন্যতম সেরা। স্পেন কোচ বলছিলেন, ‘৫০ ম্যাচে আমরা ১০০টির বেশি গোল করেছি এবং খুব কম গোল হজম করেছি। আমাদের পুরো দল একসঙ্গে রক্ষণ সামলায়। রক্ষণ মানে শুধু ডিফেন্ডার নয়, ১১ জন খেলোয়াড়ই রক্ষণে ভূমিকা রাখে।’
স্পেনের বর্তমান খেলার ধরণ কোনো একক কোচের অবদান নয় বলেও মনে করেন তিনি, ‘এটি নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে একই উন্নয়ন কাঠামো অনুসরণ করার ফল এটি। আমরা সেই দর্শনের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি, যদিও প্রত্যেক কোচ নিজের মতো কিছু নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।’