ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয় ঘিরে নতুন বিতর্ক 

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ জয় ফ্রান্সের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর সেই সোনালি স্মৃতিতে নেমে এসেছে বিতর্কের কালো ছায়া। ফ্রান্সের সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের আকস্মিক ডোপিং পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। এই মন্তব্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সেই ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ের প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে।

ফ্রান্সের সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী মারি-জর্জ বুফের এই স্বীকারোক্তি এসেছে জিদান, দ্য ক্রিয়েশন অব এ লিজেন্ড শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্রে। অথচ ২০১৩ সালে সিনেটের একটি কমিশনের সামনে শপথ নিয়ে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি এমন হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছিলেন।

প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান-এর উত্থানকে কেন্দ্র করে নির্মিত। সম্প্রতি তিনি দীর্ঘদিনের কোচ দিদিয়ে দেশমের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ফ্রান্সের জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

বুফে জানান, সরকার ও ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফএফ) মধ্যে তীব্র টানাপোড়েনের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে টিনেসে জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্পে আকস্মিক ডোপিং পরীক্ষা চালানো হয়, যেখানে সব খেলোয়াড়ের ফল নেগেটিভ আসে। তবু ওই পরীক্ষাকে দলের প্রস্তুতিতে অপ্রয়োজনীয় বাধা হিসেবে দেখেছিলেন তৎকালীন কোচ আইমে জাকে এবং ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন।

টিনেসে ডোপিং পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসক ড. অ্যালাঁ গার্নিয়েও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তার দাবি, বুফে ব্যক্তিগতভাবে তাকে পরীক্ষা বন্ধের নির্দেশের বিষয়ে নিশ্চিত করেছিলেন। 

গার্নিয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্বকাপ পর্যন্ত ফরাসি দলকে আর বিরক্ত করবেন না। অর্থাৎ কোনো আকস্মিক ডোপিং পরীক্ষা নয়।’ তিনি আরও জানান, এই নির্দেশ কখনো লিখিতভাবে দেওয়া হয়নি; শুধু মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল, যাতে কোনো লিখিত প্রমাণ না থাকে।

ড. গার্নিয়ের বক্তব্যের মুখোমুখি হলে বুফে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ড. গার্নিয়ে যদি এমন বলে থাকেন, তাহলে সেটাই সত্য।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘হুবহু ওই ভাষায় বলা হয়নি, কিন্তু অর্থ একই ছিল। এটা ছিল আমাদের পক্ষ থেকে একধাপ পিছু হটা।’

বুফের দাবি, এই সিদ্ধান্ত শুধু তার মন্ত্রণালয়ের ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দেশ সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকেই এসেছিল।

বিশ্বকাপের পর অবশ্য ডোপিংবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন বুফে। ১৯৯৯ সালে ফ্রান্সে ডোপিং প্রতিরোধে প্রথম বড় আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আমরা আবার ডোপিংবিরোধী লড়াই শুরু করি।’

তিনি আরও জানান, ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের আগে তিনি নানা ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ছিলেন। তবে এবারই প্রথম তিনি স্বীকার করলেন যে, পরবর্তীতে যে নিয়মগুলো আইনে রূপ দিয়েছিলেন, সেই নিয়মই একসময় সাময়িকভাবে স্থগিত করতে সহায়তা করেছিলেন।

বুফের এই স্বীকারোক্তির পর ফ্রান্সজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কারণ ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ জয়কে দেশটির আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এদিকে ২০১৩ সালে সিনেটে দেওয়া তার আগের সাক্ষ্যও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কখনোই এ ধরনের কোনো নির্দেশ দিইনি।’

প্রামাণ্যচিত্রটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন ফরাসি জাতীয় দল নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। ১৯৯৮ সালের সেই সোনালী প্রজন্মের জিদান ও দেশমের মতো কিংবদন্তিরা এখন কোচিংয়ের দায়িত্বে থাকলেও এই নতুন তথ্য সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনের পরিবেশকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।