ডিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন প্রকাশ্য বিপ্লবী। মাঠে ডিফেন্ডারদের নাচিয়েছেন, মাঠের বাইরে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্বাসের পক্ষে। চে গুয়েভারা কিংবা ফিদেল কাস্ত্রোর আদর্শে অনুপ্রাণিত ম্যারাডোনার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান, রাজনৈতিক বক্তব্য আর জীবনযাপন—সবকিছুই ছিল উচ্চকিত, বিতর্কিত এবং আলোচিত। তার ঠিক বিপরীত মেরুতে লিওনেল মেসি।
মেসি কখনও রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেননি। কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের পতাকা ওড়াননি। বরং বিশ্ব তাকে চিনেছে শান্ত, মিতভাষী এক ফুটবলার হিসেবে—যিনি কথার চেয়ে পায়ের জাদুকেই বেশি শক্তিশালী মনে করেন। কিন্তু মেসির এই নীরবতার মধ্যেই কি লুকিয়ে ছিল অন্য এক বিপ্লব? হয়তো ছিল।
কারণ মেসি স্লোগান দেননি, কিন্তু ফুটবল দিয়ে আর্জেন্টিনার জাতীয় আত্মমর্যাদাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা অনেক সময় রাজনৈতিক ভাষণের চেয়েও শক্তিশালী। একসময় যে মানুষটিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ব্যর্থতার প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবলের সবচেয়ে বড় জাতীয় বীর।
তার অবসর-বার্তায়ও উঠে এসেছে সেই গভীর শিকড়ের কথা। আর্জেন্টিনার হয়ে সবকিছু অর্জনের পর মেসি লিখেছিলেন, তাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। সঙ্গে ছিল দেশের প্রতি তার চিরন্তন আহ্বান—‘এগিয়ে যাও, আর্জেন্টিনা!’
তাহলে একসময় কেন শুধু ‘বার্সেলোনার মেসি’ বলে পরিচিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল? আর কীভাবে সেই মেসিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার মেসি?
তার উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে পাঁচ প্রতিপক্ষ—যাদের প্রত্যেককে নিজের ফুটবল দিয়ে একে একে হারিয়েছেন মেসি।
১. আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর আঙিনায় শ্রেষ্ঠত্ব
লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথ। দুই দেশের লড়াই শুধু একটি ম্যাচের লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অহংকার এবং জাতীয় আবেগ।
বছরের পর বছর ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল, বিশ্বমঞ্চে সাফল্য আর ট্রফির আধিপত্য আর্জেন্টাইনদের মনে তৈরি করেছিল এক ধরনের আক্ষেপ।
মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক শিরোপাখরা কাটল কোথায়? ব্রাজিলে।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারিয়ে শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে গোল না পেলেও মেসির হাতে উঠেছিল বহু প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক ট্রফি।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ঘরের মাঠে গিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা—আর্জেন্টাইন ফুটবলের জন্য এর চেয়ে প্রতীকী মুহূর্ত খুব বেশি নেই। সেদিন মেসি শুধু একটি শিরোপাই জেতেননি। যেন নিজের দেশকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস।
২. ইউরোপ বনাম লাতিন ফুটবল: আধিপত্যের পালাবদল
গত দুই দশকে বিশ্ব ফুটবলের অর্থ, অবকাঠামো, কৌশল ও তারকাখ্যাতির বড় অংশই ছিল ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের বিপুল অর্থ আর আধুনিক ট্যাকটিক্যাল কাঠামোর বিপরীতে লাতিন ফুটবলকে অনেক সময়ই দেখা হয়েছে কিছুটা পুরোনো ধাঁচের হিসেবে।
এমনকি লাতিন আমেরিকার ফুটবল নিয়ে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন তারকার বক্তব্যেও।
মেসির জবাবটা অবশ্য ছিল মাঠে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে এক মহাকাব্যিক ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সেই জয় শুধু আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ খরা ঘোচায়নি, মেসির ব্যক্তিগত মহাকাব্যকেও পূর্ণতা দিয়েছে।
লাতিন ফুটবলের আবেগ, সৃজনশীলতা ও লড়াকু মানসিকতাকে বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে মেসির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তারপরও ইউরোপের আধিপত্য পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং মেসির গল্পটি হয়ে উঠেছে দুই ফুটবল-সংস্কৃতির দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
৩. রোনালদো বনাম মেসি: ‘সর্বকালের সেরা’র বিতর্ক
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বনাম লিওনেল মেসি—এক প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এর চেয়ে বড় ব্যক্তিগত দ্বৈরথ আর কিছু নেই।
একদিকে রোনালদোর অবিশ্বাস্য অ্যাথলেটিসিজম, গোলের ক্ষুধা ও শারীরিক সক্ষমতা। অন্যদিকে মেসির ড্রিবলিং, দৃষ্টিশক্তি, পাসিং আর বল পায়ে অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ। বছরের পর বছর চলেছে বিতর্ক—কে সেরা?
তবে মেসির ক্যারিয়ারে একটি অপূর্ণতা দীর্ঘদিন থেকেই ছিল—বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে কাতারে সেই অপূর্ণতাও পূর্ণ হলো।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে দুই গোল করে, টাইব্রেকারে জিতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেন মেসি। হাতে ওঠে সেই সোনালি ট্রফি, যার অপেক্ষায় কেটেছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো।
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসিকে ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়। রোনালদোর সঙ্গে তুলনার অবসান অবশ্য কোনও একটি ম্যাচে হয়নি; কিন্তু কাতারের রাতটি সেই বিতর্কে মেসির পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিগুলোর একটি হয়ে থাকে।
আর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় অর্জন—তিনি তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছেন।
৪. বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ: এল ক্লাসিকোর সম্রাট
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাব-দ্বৈরথগুলোর একটি ‘এল ক্লাসিকো’। বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ। আর এই দ্বৈরথে মেসি ছিলেন এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নের নাম।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে গিয়ে রিয়ালকে হারানো থেকে শুরু করে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল—মেসি বারবারই মঞ্চের কেন্দ্র দখল করেছেন। ২০০৯ সালে বার্নাব্যুতে বার্সেলোনার ৬-২ গোলের ঐতিহাসিক জয় কিংবা ২০১৭ সালে শেষ মুহূর্তে গোল করে রিয়ালের সমর্থকদের সামনে জার্সি উঁচিয়ে ধরা—এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে মেসির এমন অসংখ্য মুহূর্ত আছে, যেগুলো আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
রিয়ালের বিপক্ষে তার গোলসংখ্যা, ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘ সময়ের আধিপত্য তাকে এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে অন্যতম—বরং পরিসংখ্যানের বিচারে সর্বোচ্চ গোলদাতা—করে তুলেছে।
বার্সেলোনার হয়ে মেসি শুধু রিয়ালকে হারাননি; তিনি এল ক্লাসিকোকে নিজের ব্যক্তিগত মঞ্চেও পরিণত করেছিলেন।
৫. বার্সার মেসি বনাম আর্জেন্টিনার মেসি: নিজের ছায়ার বিরুদ্ধে জয়
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ কোনও ফুটবলার ছিলেন না। কোনও দলও নয়। সেটি ছিল তার নিজেরই একটি পরিচয়—‘বার্সেলোনার মেসি’। দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, বার্সেলোনার জার্সিতে মেসি যতটা ভয়ংকর, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে তিনি ততটা নন।
কেউ তাকে ‘স্প্যানিশ’ বলে কটাক্ষ করেছেন। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রতি তার ভালোবাসা নিয়ে। কেউ আবার বলেছেন, বার্সেলোনার সাফল্যের পেছনে যে মেসিকে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার হয়ে সেই মেসি কোথায়?
মেসির সবচেয়ে বড় জয় সম্ভবত এখানেই।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা দিয়ে শুরু। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা। তারপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। সবশেষে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা।
পরপর চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে মেসি শুধু ট্রফির খরা কাটাননি, নিজের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় অভিযোগটিরও জবাব দিয়েছেন।
২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। লাখো মানুষ নেমেছিল তাদের নায়ককে বরণ করতে। সেই মুহূর্তে আর কেউ প্রশ্ন করেনি—‘বার্সার মেসি’ নাকি ‘আর্জেন্টিনার মেসি’?
কারণ উত্তরটা তখন সবার জানা।
বার্সেলোনার সেই জাদুকর, যাকে একসময় নিজের দেশের মানুষই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতীক। ম্যারাডোনা বিপ্লব করেছিলেন উচ্চকণ্ঠে। মেসি করেছেন নীরবে। ম্যারাডোনা কথা দিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন, মেসি জানিয়েছেন পায়ে।
আর সেই নীরব বিপ্লবের শেষ ছবিটা যেন একটাই—নীল-সাদা জার্সি, হাতে বিশ্বকাপ আর সামনে লাখো আর্জেন্টাইন।