দীর্ঘ আট বছর পর ঢাকায় ফিরছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে ঘরের মাঠে হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়াদের খেলা দেখতে মুখিয়ে আছেন সমর্থকেরা। কিন্তু গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার আগেই ধাক্কা খেতে হচ্ছে তাদের। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। ক্লাব হাউজ, ভিআইপি ও রেড বক্সের টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। টিকিটের এই মূল্য নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।
গতকাল বাফুফে ভবন প্রাঙ্গণে টিকিটের মূল্য নিয়ে সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম কাটেল। তার যুক্তি, একটি টিকিট দিয়ে দুটি ম্যাচ দেখা যাবে। এছাড়া মার্কেটিং কোম্পানির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সাফ সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন বাংলাদেশের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি। তার মতে, বাংলাদেশের ম্যাচ ছাড়া অন্য খেলাগুলোতে দর্শক উপস্থিতি কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এক হাজার টাকা দিয়ে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও দর্শকদের কাছে সেই মূল্য খুব একটা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না।
এমিলি বলেন, ‘বাংলাদেশের ম্যাচ ছাড়া অন্য ম্যাচগুলোতে দর্শক উপস্থিতি কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশের ম্যাচেই মূলত দর্শক হবে। অন্য ম্যাচগুলোতে গ্যালারি ভরবে না। এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচের ব্যবধান আড়াই ঘণ্টা। এই সময়ে মানুষ কী করবে? এক হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০০ কিংবা ৬০০ টাকা হলে বিষয়টি যৌক্তিক হতো।’
ফুটবলের প্রাণ সমর্থকেরা। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ফুটবলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি সমর্থকগোষ্ঠী। তাদের প্রায় সবাই সাফের টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছে।
হামজা চৌধুরী জাতীয় দলে আসার পর বাংলাদেশের ঘরের মাঠের ম্যাচগুলোতে টিকিটের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। সিঙ্গাপুর, ভারত ও হংকংয়ের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তিনটি হোম ম্যাচে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এবার সেই দাম বেড়ে হয়েছে এক হাজার টাকা, যা আগের তুলনায় আড়াই গুণ।
বাফুফের কম্পিটিশন কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম গাউসও স্বীকার করেছেন, টিকিটের দাম বেশি। তবে মূল্য নির্ধারণে বাফুফের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দাবি তার।
গোলাম গাউস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই দাম বেশি। কিন্তু এখানে বাফুফের কিছু করার ছিল না। সাফই টিকিটের দাম নির্ধারণ করেছে। আমাদের কাছে প্রস্তাব বা মতামতও চায়নি। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’
টিকিটের মূল্য নিয়ে সমালোচনা হলেও এর পেছনে রয়েছে সাফ ও বাফুফের মধ্যে কয়েক মাসের আলোচনা এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের আর্থিক হিসাব। টিকিটিং, স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দর-কষাকষির পর সমঝোতা হয়েছে, বাফুফে পাবে ৫০ লাখ টাকা এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের বাকি সব খরচ বহন করবে সাফ। সেই সমঝোতার পর সাফের মার্কেটিং পার্টনারের মতামতের ভিত্তিতে টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকায় এর আগে ২০০৯ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দুই আসরেই সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৫০ টাকার মধ্যে। এবার সেই টিকিটের মূল্য এক লাফে এক হাজার টাকা হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ব্যবধানের কারণ কী?
সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন টিকিটের দাম বাড়ার পেছনে আয়োজনের ব্যয়ের কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, সাফের নিয়মিত মার্কেটিং পার্টনার স্পোর্টস ফাইভের সঙ্গে চুক্তি না থাকায় আন্তর্জাতিক স্পন্সর পেতে সময় লাগছে। এ কারণে এবারের টুর্নামেন্টের জন্য নতুন মার্কেটিং পার্টনার হিসেবে টিএসএকে নেওয়া হয়েছে।
কাজী সালাউদ্দিন বলেন, ‘বাফুফের রয়্যালিটি, স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা, ভিএআর, দলগুলো ও রেফারিদের আসা-যাওয়া মিলিয়ে অনেক ব্যয় হচ্ছে তাদের। সেই ব্যয় উঠানোর জন্য তারা এই দাম নির্ধারণ করেছে।’
তবে ব্যয়ের এই যুক্তি সমর্থকদের অসন্তোষ কমাতে পারেনি। ফুটবলপ্রেমী রাইয়ান হাসানের মতে, টিকিটের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে রাখা হলে দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়ার সুযোগ থাকত। তাতে গ্যালারি পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ত।
অন্যদিকে কাজী সালাউদ্দিনের ব্যাখ্যা, টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিপুল ব্যয় বিবেচনায় টিকিটের দাম কমিয়ে প্রত্যাশিত আয় তুলে আনা কঠিন।
তিনি বলেন, ‘এত ব্যয়ের পর তাদের রিটার্ন উঠানো বাস্তবিকভাবেই কঠিন। সাফের দৃষ্টিকোণ থেকে টুর্নামেন্টটি তিন বছর পর আয়োজন হতে যাচ্ছে এবং সফলভাবে হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।’
সাফের আয়-ব্যয়ের নতুন বাস্তবতা
অতীতে সিনিয়র পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ভালো পরিমাণ অর্থ আয় করত সাফ। সেই অর্থ দিয়ে অন্য টুর্নামেন্ট আয়োজন ও পরিচালনার ব্যয় মেটানো হতো। কিন্তু স্পোর্টস ফাইভের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হওয়ার পর সাফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই টুর্নামেন্ট আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি মার্কেটিং কোম্পানি টিএসএ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মার্কেটিং স্বত্ব নেয়। টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য তারা সাফকে অর্থ দিয়েছে। সেই অর্থ থেকে সাফ আয়োজনের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি বাফুফেকেও রয়্যালিটি দেবে।
মার্কেটিং স্বত্ব নেওয়ার পর টুর্নামেন্টের স্পন্সরশিপ, টিকিট, টেলিভিশন ও মাঠের স্বত্ব বিক্রি করে আয় করবে টিএসএ। ফলে এবারের সাফে টিকিটের মূল্য নির্ধারণে মাঠের দর্শকসংখ্যার পাশাপাশি পুরো আয়োজনের বাণিজ্যিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে আয়-ব্যয়ের হিসাব আর আয়োজকদের যুক্তির বাইরে সমর্থকদের চাওয়া খুব সরল-প্রিয় দলকে মাঠে বসে দেখার সুযোগ। এক হাজার টাকা টিকিটের দাম সেই সুযোগ কতটা সহজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত টিকিটের উচ্চমূল্য দর্শকদের মাঠে আসতে নিরুৎসাহিত করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।