ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, সামনে শিরোপা জয়ের হাতছানি। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলকে আবারও দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে দেখতে চান তপু বর্মন। চোটের কারণে ফিফা আসিয়ান কাপে খেলতে না পারলেও এখন পুরোপুরি সুস্থ এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। জাতীয় দলের রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি সতীর্থদের নিয়ে ঘরের মাঠে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
সোমবার জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের অনুশীলনের ফাকে সাংবাদিকদের তপু জানান, চোটের কারণে আসিয়ান কাপের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি তার। তবে এখন সুস্থ হয়ে সাফের প্রস্তুতিতে ফিরেছেন তিনি।
তপু বলেছেন, ‘ইনজুরির কারণে আমাদের শেষ যে ট্যুরটা ছিল আসিয়ান কাপ, সেখানে যেতে পারিনি। শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। এখন সবকিছু মিলিয়ে খুবই ভালো আছি, সুস্থ আছি।’
আগামী ৪ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আট বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে ফিরছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের এই প্রতিযোগিতা। নিজেদের দর্শকদের সামনে খেলার সুযোগকে বিশেষ মনে করছেন তপু। তবে শুধু অংশগ্রহণ নয়, লড়াই করে শিরোপা জেতাই তার লক্ষ্য।
তিনি বলেছেন, ‘সাফ আমাদের জন্য অনেক স্পেশাল এবং আমাদের ঘরের মাঠে খেলা। আট বছর পরে আবার আমরা আমাদের মাটিতে খেলছি। এটা ডেফিনেটলি আমাদের জন্য স্পেশাল মোমেন্ট। আমাদের ফাইট করতে হবে। ফাইট করে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য, ট্রফি জেতা- ২৩ বছর পরে আমরা সেটা করতে চাই, পুনরায় আমাদের মাটিতেই। সেভাবেই আমাদের প্রস্তুত হতে হবে এবং প্রস্তুত থাকতে হবে।’
নতুনদের নিয়ে আশাবাদী তপু
জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে এবার যুক্ত হচ্ছেন বেশ কয়েকজন নতুন মুখ। অনূর্ধ্ব-২০ দল থেকে উঠে আসা মাহি খানও প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। নতুনদের আগমনকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তপু।
তার ভাষায়, ‘মাহি খান একদম নতুন। আমাদের সঙ্গে জাতীয় দলে প্রথম সে যোগ দিয়েছে। সে অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলেছে। দুজন খেলোয়াড় মূল জাতীয় দলে আসছে, দুজনই নম্বর নাইন। এটা আমাদের দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পজিশন। খুবই এক্সাইটিং।’
রক্ষণ মজবুত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের রক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম ম্যাচে তিন গোল এবং শেষ ম্যাচে নয় গোল হজম করেছে দল। এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্স কাটিয়ে উঠতে শুধু ডিফেন্ডার কিংবা গোলকিপার নয়, পুরো দলকে রক্ষণে দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করেন তপু।
তিনি বলেছেন, ‘যখন গোল হজম করি, গোলকিপার-ডিফেন্ডারকে ফেস করতে হয়। আসলে গোলকিপার-ডিফেন্ডারের দোষ থাকে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টিম ডিফেন্ডিং, যেটা বিশ্ব ফুটবলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি দলগতভাবে ডিফেন্ড করতে পারি, ডেফিনেটলি এত গোল হজম করব না।’
নিজের দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন এই ডিফেন্ডার। রক্ষণভাগকে সংগঠিত করা এবং সতীর্থদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
তপুর মতে, ‘তিন গোল আমরা প্রথম ম্যাচে খেয়েছি, শেষ ম্যাচে ৯ গোল খেয়েছি, এটা খুবই হতাশাজনক। আমরা ৯ গোল কবে হজম করেছি, আই ডোন্ট নো। আমার ভূমিকা থাকবে পেছন থেকে নিজের সেরাটা দেওয়া এবং কীভাবে ডিফেন্স লাইনকে শক্ত করা যায়, সেই গাইডেন্স আমি অবশ্যই করব।’
জিদানের সঙ্গে জুটি গড়ার প্রত্যাশা
তরুণ ডিফেন্ডার জিদান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক করেছেন। তার সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়িয়ে রক্ষণে ভালো জুটি গড়তে চান তপু। এশিয়ান কাপে খেলার অভিজ্ঞতা তরুণ এই ফুটবলারের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে বলেও মনে করেন তিনি।
তপুর মূল্যায়ন, ‘সে অনেক কম বয়সী। এশিয়ান কাপে সে তিনটি ম্যাচই খেলেছে- দুটিতে একাদশে ছিল, প্রথম ম্যাচে ৪৫ মিনিট পরে নেমেছে। এই পর্যায়ে খেলার জন্য কী ধরনের মানসিকতা লাগে, শারীরিকভাবে কীভাবে অ্যাপিয়ার করতে হয়, পারফরম্যান্স- সবকিছু মিলিয়ে তার ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে।’
রিদওয়ানের সঙ্গে আগেও অনুশীলনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তপুর। সাফের ম্যাচের আগে প্রায় নয় দিন সময় পাওয়ায় নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া আরও ভালো হবে বলে আশাবাদী তিনি, ‘আজ থেকে আমাদের পরের ম্যাচ ৫ নভেম্বর। আমরা নয় দিন সময় পাব। ডেফিনেটলি এই নয় দিনে আমাদের ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে। আগেও লাস্ট ক্যাম্পে তার সঙ্গে ট্রেনিং করেছি। সবকিছু মিলিয়ে একটা ভালো কম্বিনেশন হবে বলে মনে করি। ম্যাচ বাই ম্যাচ আমরা সেটাকে আরও বেশি ইমপ্রুভ করব।’
প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, লক্ষ্য শিরোপা
ঘরের মাঠে দর্শকদের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য বাড়তি প্রেরণা হবে বলে মনে করেন তপু। তার প্রত্যাশা, জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারি থাকবে কানায় কানায় পূর্ণ।
তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দেশে খেলা এবং আমরা সমগ্র বাংলাদেশের সাপোর্ট পাব। স্টেডিয়াম পুরো প্যাক থাকবে। একটা ডিফরেন্ট লেভেলের অনুভূতি থাকবে।’
তবে শিরোপা জিততে হলে প্রতিপক্ষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। ভারত, নেপাল কিংবা অন্য যে দলই সামনে আসুক, সবাইকে হারানোর মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে বলে মনে করেন এই ডিফেন্ডার।
তপুর স্পষ্ট কথা, ‘আপনি যখন চ্যাম্পিয়ন হতে যাবেন, ডেফিনেটলি আপনার রাইভাল টিমকে, অপজিশনের টিমকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। এটা যেকোনো দল হতে পারে- ভুটান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ। সবাইকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। এই মেন্টালিটি নিয়েই আমাদের মাঠে নামতে হবে।’
হামজা না থাকলেও জয়ের আশা
ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হামজা চৌধুরী ও ফারহান আলীকে পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন তপু। হামজা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তার অনুপস্থিতি দলকে ভোগাবে, তবে দলগত পারফরম্যান্স দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন তপু।
তিনি বলেছেন, ‘সমগ্র টিম থাকবে। হয়তো যত দূর জানি, ফারহান আলী এবং হামজা প্রথম ম্যাচে আসতে পারবে না। ডেফিনেটলি হামজা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। সে যদি আমাদের সঙ্গে না আসতে পারে, বিশেষ করে প্রথম ম্যাচে, তাহলে তাকে মিস করব।’
তবে হামজার অনুপস্থিতিকে অজুহাত বানাতে চান না তপু। তার মতে, টুর্নামেন্টে ভালো শুরু করতে হলে প্রথম ম্যাচ জেতা জরুরি, ‘আমরা যদি দলগতভাবে খেলতে পারি, ডেফিনেটলি তার অনুপস্থিতি অনুভব করব, বাট ভালোভাবে খেলতে পারলে এটা শুধরাতে পারব। প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি টিকে থাকতে চান, ডেফিনেটলি প্রথম ম্যাচ জিততে হবে। তার মানে আপনি একটা ভালো শুরু করলেন।’
শৃঙ্খলায় ছাড় নয়
জাতীয় দলের ম্যানেজারের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলার বিষয়ে ‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’- এমন বার্তাকেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন তপু। তার মতে, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলতে হলে পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আচরণ ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল হতে হবে।