দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে অনুষ্ঠিত বড় আন্তর্জাতিক গেমসে বাংলাদেশের পদকপ্রাপ্তির সংখ্যা বরাবরই কম। নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও পদকের ধারে-কাছেও যেতে পারছেন না বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা। সবশেষ স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস থেকেও শূন্য হাতে ফিরেছে। যেখানে ১০ লাখেরও কম জনসংখ্যার ১২টি সদস্য দেশ পদক জিতেছে, সেখানে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশের অর্জনের খাতায় আবারও শূন্য!
এ নিয়ে অংশীজনরা দিয়েছেন নানা ব্যাখ্যা। প্রশ্ন উঠছে-কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) ও দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো? দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই কি এর মূল কারণ?
২০০২ সালের ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে সর্বশেষ স্বর্ণ এবং ২০১৮ সালের গ্লাসগো গেমসে রৌপ্য জেতার পর টানা দুই আসরে (২০২২ ও ২০২৬) একটি পদকও পায়নি বাংলাদেশ। বিষয়টি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শেষ দুই কমনওয়েলথ গেমসে শুটিং না থাকাটিও বাংলাদেশের পদকশূন্যতার অন্যতম কারণ। অথচ প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও সাফল্য দেখিয়েছে।
চার ডিসিপ্লিনে অংশ, পদকশূন্য বাংলাদেশ
সদ্য সমাপ্ত গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে হতাশ করেছেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা। এবারের আসরে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ১৫ জন ক্রীড়াবিদ। সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, বক্সিং ও জিমন্যাস্টিক্স—এই চার ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে সবচেয়ে কাছে গিয়েও পদক হাতছাড়া করেছেন বক্সার রাকিব। ৫৫ কেজি ওজন শ্রেণির কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষের কাছে হেরে যান তিনি। সেমিফাইনালে উঠতে পারলে অন্তত ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল।
এমন পারফরম্যান্সে হতাশ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও গ্লাসগো গেমসে বাংলাদেশের শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদ। তার ব্যাখ্যা, ‘সরকার এবং ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা পরিকল্পনা নেই। আমরা কোন গেমসে কি অর্জণ করতে চাই, সেটা করতে হলে কী কী করা দরকার, সেগুলো নিয়ে কোন পক্ষেরই মাথাব্যথা নেই। এভাবে চলতে থাকলে, বারবার মাথা নিচু করেই ফিরতে হবে।’
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে বিওএর মহাসচিব জোবায়দুর রানাও একই কথা বলেছিলেন,‘অলিম্পিক,এশিয়ান কিংবা কমনওয়েলথ গেমসে পদক পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদে প্রস্তুতি নিতে হয়। সেভাবে সুবিধাদি দিতে হয়। আমরা তো সব সময় তা দিতে পারি না। এই যেমন ক্যাম্পের জন্য সময় মতো অর্থ ছাড় হয় না। তাই বড় গেমসে সেভাবে ভালো করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’
২০০২ সালের ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে শ্যুটার আসিফ হোসেন খান ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে স্বর্ণ জেতেন। কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের পদকখরা নিয়ে এই শ্যুটার বলেন, ‘২০০২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত কমনওয়েলথ গেমসে শ্যুটাররা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশকে পদক এনে দিয়েছে। ২০২২ ও ২০২৬ সালে ইংল্যান্ড কমনওয়েলথের স্বাগতিক ছিল। দুই বারই শ্যুটিং ছিল না। শ্যুটিং না থাকায় বাংলাদেশের পদকপ্রাপ্তিতে প্রভাব পড়েছে। শ্যুটিংয়ের পাশাপাশি অন্য খেলাতেও পদক পাওয়া প্রয়োজন।'
তবে শুধু শুটিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও পদক পাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাডমিন্টনে সাবেক চ্যাম্পিয়ন এলিনা সুলতানার উপলব্ধি, ‘একটা লং টার্ম ট্রেইনিংয়ের যদি ব্যবস্থা রাখা যায়, তাহলেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, দেখা যাবে যে, আমরা শুধু অংশগ্রহণই করতে পারবো।’
ভারত কীভাবে পদক পাচ্ছে?
ভারত রাতারাতি আজকের অবস্থানে পৌঁছায়নি। দেশটির এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ।
২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমসে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে পদক তালিকায় চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে ভারত। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে অন্যতম সেরা অভিযান উপহার দিয়ে ভারতীয় দল জিতেছে মোট ৩৯টি পদক। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি সোনা, ১৭টি রুপা ও ৯টি ব্রোঞ্জ।
খেলো ইন্ডিয়া
ভারত সরকার ‘খেলো ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায় থেকে হাজার হাজার প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করছে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি বৃত্তি দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ‘টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম’-এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় পদকজয়ীদের বিশ্বের সেরা কোচিং, সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
নারী বক্সিংয়ের সাফল্য
বিশেষ করে নারী বক্সিংয়ে ভারতের অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট অ্যাকাডেমি মডেলে বিনিয়োগ। মেরি কম, নিখাত জারিন, লাভলিনা বরগোহাইনের মতো অ্যাথলেটদের সাফল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে তোলা হয়েছে হাই-পারফরম্যান্স সেন্টার।
মণিপুর ও হরিয়ানার মতো রাজ্যে এসব কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, বিদেশি কোচ এবং মানসিক শক্তি বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভারতীয় অ্যাথলেটদের প্রস্তুতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এবার মোট ৫৩.০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই অর্থ ব্যয় হয়েছে বিদেশে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, কোচিং, স্পোর্টস সায়েন্স সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য।
চূড়ান্ত পদক সংখ্যার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি পদকের জন্য ভারতের খরচ হয়েছে আনুমানিক ১.৩৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কী বলছেন?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করেছেন। ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচির মাধ্যমে উদীয়মান প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের তুলে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদকপ্রাপ্তির বিষয়ে সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক বলেছেন,‘আমাদের লক্ষ্য অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ বা সাফে নিয়মিত পদক জয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নও প্রয়োজন। আমরা সরকারে এসেছি বেশি দিন হয়নি। এরই মধ্যে ক্রীড়া ক্ষেত্রে উন্নয়নে নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে নতুন করে খেলোয়াড় আসছে। সারা দেশে খেলা নিয়ে আলোড়ন হচ্ছে। আমরা বাছাই কৃত খেলোয়াড়দের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রশিক্ষণ দেবো। এরই মধ্যে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনা হয়েছে। যেন তাদের পরিবার নিয়ে চিন্তা করতে না হয়।’
এরপরই তিনি যোগ করেন,‘সবকিছু মিলিয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করে কাজ করছি। যেন সামনের দিকে আন্তর্জাতিক গেমসগুলোতে পদক আসে। এর জন্য সব রকমের সহযোগিতা দেওয়া হবে। একটু সময়ও লাগবে।’
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু অংশগ্রহণ নয়, পদকের জন্য কতটা পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শুটিংয়ের মতো ঐতিহ্যগত পদকের ডিসিপ্লিন ফিরে এলে সুযোগ বাড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য পেতে হলে অন্যান্য খেলাতেও প্রতিভা খুঁজে বের করা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।