জেনারেটিভ এআইয়ের সহায়তায় প্রথমবারের মতো এমন একটি ভাইরাসের নকশা তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক, যার অস্তিত্ব প্রকৃতিতে আগে কখনও পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, এই সাফল্য অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য অপব্যবহার ও বায়োসিকিউরিটি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও আর্ক ইনস্টিটিউটের একদল গবেষকের যৌথ গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ইভো১ ও ইভো২ নামে দুটি জিনোম ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করা হয়। এগুলো অনেকটা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) মতো কাজ করে। তবে শব্দের পরিবর্তে এসব মডেল ডিএনএর জিনগত ক্রম বিশ্লেষণ করে নতুন জিনোমের নকশা তৈরি করতে পারে।
গবেষণার জন্য মডেল দুটিকে প্রায় ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফাজের জিনোম দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ব্যাকটেরিওফাজ এমন একধরনের ভাইরাস, যা শুধু ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়া মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদের কোষকে এগুলো সংক্রমিত করতে পারে না।
গবেষকেরা প্রাকৃতিক Φএক্স১৭৪ ব্যাকটেরিওফাজকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে হাজার হাজার নতুন জিনোমের নকশা তৈরি করেন। পরে সেখান থেকে প্রায় ২৮৫টি নকশা পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষ করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি সম্পূর্ণ কার্যকর ভাইরাসে পরিণত হয়। এসব ভাইরাস সফলভাবে ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে নকশা করা কয়েকটি ভাইরাস ওষুধ-প্রতিরোধী Escherichia coli (E. coli) ব্যাকটেরিয়া দমনে প্রাকৃতিক ফাজের তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল। এমনকি কয়েকটি ভাইরাসে শত শত নতুন জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে, যার সঙ্গে আগে পরিচিত কোনো প্রাকৃতিক ভাইরাসের পুরোপুরি মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে থাকা স্ট্যানফোর্ডের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বলেন, ‘আমরা এর আগে দেখিয়েছি, এই মডেলগুলো একটি জিন, এমনকি একসঙ্গে কাজ করা দুটি জিনও নকশা করতে পারে। এবার সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা দেখাতে পারলাম যে, একটি সরল ব্যাকটেরিওফাজের সম্পূর্ণ জিনোমও ডিজাইন করা সম্ভব।’
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফাজ থেরাপির মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চিকিৎসা-প্রযুক্তির এই অগ্রগতি নিয়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একই ধরনের এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্ষতিকর রোগজীবাণু তৈরিতে অপব্যবহার হতে পারে।
যদিও এই গবেষণায় মানুষ, প্রাণি বা উদ্ভিদের রোগসৃষ্টিকারী ভাইরাস ব্যবহার করা হয়নি এবং প্রশিক্ষণ কেবল ব্যাকটেরিওফাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও গবেষকদের মতে এআই-নির্ভর জিনোম নকশা, ডিএনএ সংশ্লেষণ এবং পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার ওপর আরও কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ও বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।