প্রচলিত কম্পিউটারের বিকল্প হিসেবে ডিএনএ ব্যবহার করে নতুন ধরনের কম্পিউটার তৈরি করেছেন আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। এক ফোঁটা পানির মধ্যে থাকা কোটি কোটি, এমনকি ট্রিলিয়নসংখ্যক ডিএনএ সূত্র ব্যবহার করে হিসাব-নিকাশ করতে পারে এই কম্পিউটার। গবেষকদের দাবি, এটি এখন পর্যন্ত তৈরি দ্রুততম ডিএনএ কম্পিউটারগুলোর একটি।
গবেষণার ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই যন্ত্রটির নাম স্ক্যাফোল্ডেড ডিএনএ কম্পিউটার (এসডিসি)। প্রচলিত কম্পিউটারের মতো সিলিকন ও ট্রানজিস্টরের পরিবর্তে এটি হিসাব-নিকাশের জন্য জীবনের মৌলিক উপাদান ডিএনএ ব্যবহার করে।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, পানি, লবণ, ছোট ডিএনএ সূত্র এবং দীর্ঘ একটি ডিএনএ কাঠামো দিয়ে তৈরি এই কম্পিউটার। প্রচলিত কম্পিউটারের মতো ধারাবাহিকভাবে শক্তি সরবরাহ করে একের পর এক হিসাব করার পরিবর্তে, ডিএনএ সূত্রগুলোর পারস্পরিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এটি উত্তর খুঁজে নেয়।
গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যামিয়েন উডস বলেন, অণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি কাঠামো তৈরি করে, আর সেই কাঠামোটিই উত্তর। এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো, অবিরাম শক্তি সরবরাহ ছাড়াই এটি স্বাভাবিকভাবে উত্তর খুঁজে নিতে পারে।
গবেষকরা সাধারণ গুণ থেকে শুরু করে ৮-বিট প্যারিটি শনাক্তকরণ পর্যন্ত মোট ৭০০ ধরনের হিসাবের মাধ্যমে কম্পিউটারটি পরীক্ষা করেন। এতে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক ফল পাওয়া যায়।
সহজ হিসাবের উত্তর পেতে কয়েক ডজন সেকেন্ড লাগলেও জটিল সমস্যার সমাধানে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই একক হিসাবের গতির বিচারে ডিএনএ কম্পিউটার প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত নয়।
গবেষণার সহ-প্রথম লেখক মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিস্টান স্টেরিন বলেন, ‘টেস্টটিউবে বিক্রিয়াটি দ্রুত ঘটে, তবে সিলিকনের মতো দ্রুত নয়। আর এটি সে উদ্দেশ্যেও তৈরি করা হয়নি। কিন্তু অন্যান্য ডিএনএ কম্পিউটারের তুলনায় আমাদেরটি দ্রুততম’।
নতুন এই প্রযুক্তি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপ কম্পিউটারের জায়গা নেবে- এমনটা মনে করছেন না গবেষকরা। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহার, একই সময়ে বিপুলসংখ্যক হিসাব সম্পন্ন করা এবং তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডিএনএ কম্পিউটারের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
এসডিসি কম্পিউটারে হিসাব শুরু করতে সামান্য তাপই যথেষ্ট। এর ডিএনএ সূত্রগুলোর পৃথক বিক্রিয়া ধীরগতির হলেও একই সময়ে বিপুলসংখ্যক সূত্রের বিক্রিয়ার মাধ্যমে বড় পরিসরে দ্রুত হিসাব করা সম্ভব হতে পারে।
২০২৩ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ১০০ বিলিয়নেরও বেশি স্বতন্ত্র বিন্যাস সমর্থন করতে সক্ষম ডিএনএ সার্কিটের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।
তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ডিএনএর সম্ভাবনা ব্যাপক। তাত্ত্বিকভাবে, মাত্র এক ঘন সেন্টিমিটার ডিএনএতে এক ট্রিলিয়ন সিডির সমপরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
নতুন এই গবেষণা দেখিয়েছে, জীবনের মৌলিক উপাদান ডিএনএ ভবিষ্যতে কম্পিউটিং প্রযুক্তির ধারণা বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ড্যামিয়েন উডস বলেন, এটি এমন এক বিজ্ঞান, যার সম্ভাবনার সীমানা এখনও অজানা। ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তা আমরা জানি না।
সূত্র: পপুলার মেকানিকস