ফোনের নেশা কমাবে ফোনই! শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির কৌশল

প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশুদেরও স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রতি নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। গবেষণা বলছে, ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক গড় স্ক্রিন টাইম প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা, আর কিশোরদের ক্ষেত্রে তা ৮ ঘণ্টারও বেশি হতে পারে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সময়ে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগের ঘাটতি, স্থূলতা, মানসিক চাপ এবং অনুপযুক্ত অনলাইন কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে সমস্যার সমাধানেও সহায়ক হতে পারে প্রযুক্তি। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ, ডিজিটাল মনিটরিং টুল এবং বিভিন্ন বিল্ট-ইন ফিচার ব্যবহার করে অভিভাবকেরা শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং ডিজিটাল জগতকে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারেন।

১. বিল্ট-ইন স্ক্রিন টাইম ও প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করুন

অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস ডিভাইসে আলাদা সফটওয়্যার ছাড়াই স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের সুবিধা রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডের ডিজিটাল ওয়েলবিং এন্ড প্যারেন্টাল এবং অ্যাপেলের স্ক্রিন টাইম ফিচারের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় প্রতিদিন কতক্ষণ ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে, কোন অ্যাপ কত সময় ব্যবহার করা যাবে এবং কখন ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমিত হবে।

এ ছাড়া এসব ফিচারের মাধ্যমে দৈনিক ও সাপ্তাহিক ব্যবহারের রিপোর্ট দেখা যায়। এতে অভিভাবকরা সন্তানের ডিজিটাল অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন।

২. অ্যাডভান্সড প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করুন

একাধিক ডিভাইস ব্যবস্থাপনার জন্য গুগল ফ্যামিলি লিংক এবং অ্যাপল ফ্যামিলি শেয়ারিং কার্যকর টুল। এগুলোর মাধ্যমে অভিভাবকরা দূর থেকেই সন্তানের ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

এসব ফিচারের সাহায্যে নির্দিষ্ট সময় পর ডিভাইস লক করা, স্কুল টাইম চালু করে ক্লাস চলাকালে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং প্রতিটি অ্যাপের জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা যায়। ফলে শিশুর হাতে ফোন থাকলেও সেটি পূর্বনির্ধারিত নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

আরও বিস্তারিত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে কুস্টোডিও, নর্টন ফ্যামিলি, নেট ন্যানি ও বার্কের মতো অ্যাডভান্সড প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। এসব অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্রিন টাইম, অ্যাপ লিমিট, ব্যবহার রিপোর্ট এবং ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ এক জায়গা থেকে পরিচালনা করা সম্ভব।

বিশেষ করে কর্মজীবী অভিভাবকদের জন্য দূর থেকে সন্তানের ডিজিটাল অভ্যাস পর্যবেক্ষণে এসব প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম আলাদা করুন

বর্তমানে অনেক শিশু অনলাইন ক্লাসের জন্য গুগল ক্লাসরুম, মাইক্রোসফট টিমস, জুম বা গুগল মিট ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় অনলাইন ক্লাসে অংশ নেয়। তাই শিক্ষামূলক স্ক্রিন টাইম এবং বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইমকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

গুগল ফ্যামিলি লিংক, অ্যাপল স্ক্রিন টাইম এবং মাইক্রোসফট ফ্যামিলি সেফটি ব্যবহার করে শিক্ষামূলক অ্যাপের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় বরাদ্দ রাখা যায়। অন্যদিকে গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপের জন্য নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা যায়।

এতে অনলাইন শিক্ষায় বাধা না দিয়েই অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো সম্ভব।

৪. কম্পিউটার ও গেমিং কনসোলে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল চালু করুন

শুধু স্মার্টফোন নয়, কম্পিউটার ও গেমিং কনসোলেও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। মাইক্রোসফট ফ্যামিলি সেফটি ব্যবহার করে উইন্ডোজ কম্পিউটারে অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা যায়।

একইভাবে প্লেস্টেশন প্যারেন্টাল কন্ট্রোলস, এক্সবক্স ফ্যামিলি সেটিংস এবং নিন্তেন্দো সুইচ প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করে গেম খেলার সময় নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ে গেম বন্ধ করা এবং দৈনিক বা সাপ্তাহিক ব্যবহারের সীমা ঠিক করা যায়।

৫. ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করুন

শিশুদের স্ক্রিন টাইমের বড় একটি অংশজুড়ে থাকে ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে ইউটিউব ও ইউটিউব শর্টস।

ইউটিউবে থাকা ‘টেক এ ব্রেক রিমাইন্ডার’ এবং বেডটাইম রিমাইন্ডার ফিচার নির্দিষ্ট সময় পর বিরতির জন্য নোটিফিকেশন দেয়। অন্যদিকে ইউটিউব কিডসে অভিভাবকরা সেশন টাইমার সেট করতে পারেন। নির্ধারিত সময় শেষ হলে অ্যাপ ব্যবহারে সীমা আরোপ করা যায়।

এতে শিশুদের দীর্ঘ সময় একটানা ভিডিও দেখার অভ্যাস কমাতে সহায়তা করে।

৬. ওয়াই-ফাই রাউটার দিয়েও স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন

বর্তমান অনেক স্মার্ট ওয়াই-ফাই রাউটারে বিল্ট-ইন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ও ডিভাইস শিডিউলিং সুবিধা রয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ডিভাইসের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা শিশুদের ঘুমের রুটিন ঠিক রাখতে এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রযুক্তি যেমন শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং পারিবারিক নির্দেশনার সমন্বয়েই শিশুদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।