দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে আমাদের দিনের একটা বড় অংশই যায় স্মার্টফোনের পর্দায়। বর্তমানে প্রতিটি কাজের জন্য স্মার্টফোনের প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা এতটাই বেড়েছে যে, তা থেকে বের হয়ে আসার কোনও বাস্তবসম্মত পথ নেই।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বয়সের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে কাটান, যার বড় একটি অংশই স্মার্টফোনে ব্যয় হয়।
চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়, তাকে স্মার্টফোন ভিশন সিনড্রোম বা ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলা হয়। এটি কোনও একক রোগ নয়। বরং চোখ, দৃষ্টিশক্তি ও আশপাশের পেশিতে তৈরি হওয়া একগুচ্ছ উপসর্গের সমষ্টি।
কেন হয় এই সমস্যা
স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় সবাই সাধারণত খুব কাছ থেকে এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে চোখের সিলিয়ারি পেশিকে দীর্ঘক্ষণ একই দূরত্বে ফোকাস ধরে রাখতে হয়। একই সঙ্গে স্মার্টফোন চালানোর লম্বা সেশনে চোখের পলক ফেলার হার অনেকাংশে কমে যায়।
মায়ো ক্লিনিকের অপটোমেট্রিস্ট ডা. মুরিয়েল শোরন্যাক বলেন, স্ক্রিনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে মানুষের চোখের পলক ফেলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় কয়েক সেকেন্ড পরপর চোখের পলক পড়লেও স্ক্রিন ব্যবহারের সময় অনেকেই ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত পলক ফেলেন না। এতে অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া ও ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা তৈরি হয়। উজ্জ্বল স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো, পর্দার ছোট অক্ষর, অন্ধকারে ফোন ব্যবহার এবং দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া ব্যবহার সমস্যাকে আরও বাড়ায়।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে
স্মার্টফোন ভিশন সিনড্রোমের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে চোখে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা, ঝাপসা দেখা, চোখ শুষ্ক বা লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত পানি পড়া, জ্বালাপোড়া, আলোতে অস্বস্তি, মাথাব্যথা, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা এবং দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের পর ফোকাস করতে সমস্যা হওয়া। অনেকের ক্ষেত্রে কিছু সময়ের জন্য দ্বৈত দৃষ্টি বা ডাবল ভিশনও দেখা দিতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ কোনও না কোনও পর্যায়ে ডিজিটাল আই স্ট্রেইনের উপসর্গ অনুভব করেন।
অবহেলা করলে কী হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যা সাধারণত স্থায়ীভাবে চোখ নষ্ট করে না। তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চোখের ক্লান্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, শুষ্ক চোখের সমস্যা বাড়তে পারে, কাজ বা পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং মাথাব্যথা ও ঘাড়ের ব্যথা নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
আগে থেকেই শুষ্ক চোখ, মাইনাস পাওয়ার বা অন্যান্য দৃষ্টিজনিত সমস্যা থাকলে উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। তাই লক্ষণ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যেভাবে কমাবেন ঝুঁকি
অনেকেই এই সমস্যাটির কার্যকর সমাধান হিসবে ব্লু কাট লেন্সযুক্ত চশমা ব্যবহার করে থাকেন। তবে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়। তারা সাধারণত ‘২০-২০-২০ নিয়ম’ অনুসরণের পরামর্শ দেন। এর অর্থ হলো- প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনও বস্তুর দিকে তাকান।
পাশাপাশি নিজ থেকে সচেতন থেকে বেশি বেশি পলক ফেলুন, স্ক্রিন চোখ থেকে অন্তত ৪০–৭৫ সেন্টিমিটার দূরে রাখুন এবং স্ক্রিনের ওপরের অংশ যেন চোখের সমতলের সামান্য নিচে থাকে, বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
দৃষ্টিশক্তি সংশোধনের জন্য নির্ধারিত পাওয়ারযুক্ত চশমা বা কনট্যাক্ট লেন্স থাকলে স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় তা ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী ফোনের ফন্ট বড় করুন, অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা কমিয়ে-বাড়িয়ে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্রাইটনেস ব্যবহার করুন, অন্ধকারে স্মার্টফোন চালানো থেকে বিরত থাকুন এবং দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
চোখে যেকোনো সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বারবার দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।









