‘এআইয়ের গডমাদার’ হিসেবে পরিচিত বিশ্বখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী ফেই-ফেই লির প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড ল্যাবস কিনে নিচ্ছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস বা এএমডি। মঙ্গলবার এএমডি জানিয়েছে, ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ করা হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে বছরের শেষ নাগাদ চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফেই-ফেই লিকে। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্ট্যানফোর্ডের এআই ল্যাবের পরিচালক ছিলেন তিনি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে স্ট্যানফোর্ড থেকে সাময়িক ছুটিতে থাকাকালে গুগলের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং গুগল ক্লাউডের এআই ও এমএল বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
চীনের চেংদুতে জন্ম নেওয়া লি ১৫ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে যান। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পদার্থবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেন।
স্ট্যানফোর্ডের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ২০০৬ সালে মানুষের মতো কম্পিউটারকে দেখতে শেখানোর জন্য বিপুলসংখ্যক ছবির একটি ভিজ্যুয়াল ডেটাসেট তৈরির কাজ শুরু করেন লি। এতে প্রশিক্ষণের জন্য লাখ লাখ ছবিকে শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ২০০৯ সালের মধ্যে ক্রাউডসোর্সড কর্মীদের সহায়তায় লি ও তার দল ৩২ লাখ ছবি লেবেল বা শ্রেণিবদ্ধ করে।
২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত করে। তিনি স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান-সেন্টারড এআই এবং এআইফোরঅল নামে এআই খাতে বৈচিত্র্য বাড়াতে কাজ করা একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। জিওফ্রি হিনটন ও জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে তিনি কুইন এলিজাবেথ প্রাইজ ফর ইঞ্জিনিয়ারিংও পেয়েছেন।
২০২৪ সালে লি ওয়ার্ল্ড ল্যাবস প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রিমাত্রিক পরিবেশ বুঝতে, উপলব্ধি করতে এবং তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে সক্ষম ‘লার্জ ওয়ার্ল্ড মডেল তৈরিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার চার মাসের মধ্যে ২৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করে ওয়ার্ল্ড ল্যাবস। তখন প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ছিল ১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ওয়ার্ল্ড ল্যাবসের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে এনভিডিয়া, এএমডি, অটোডেস্ক, আন্দ্রেসেন হোরোভিটজ ও এনইএ। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে মার্বেল নামে তাদের প্রথম বাণিজ্যিক পণ্যও চালু করেছে।
ল্যাপটপ ও গেমিং কনসোলের জন্য চিপ তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এএমডি। সনি করপোরেশনের প্লেস্টেশন ৫ এবং মাইক্রোসফটের এক্সবক্সেও এএমডির চিপ ব্যবহৃত হয়। তবে প্রধান নির্বাহী লিসা সুয়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
এএমডির হেলিওস র্যাক-স্কেল সিস্টেম এনভিডিয়ার গ্রেস ব্ল্যাকওয়েল ও ভেরা রুবিন সিস্টেমের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। মাইক্রোসফট, মেটা, ওরাকল ও ওপেনএআই এএমডির এআই চিপ ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টার ব্যবসা থেকে আয় দ্বিগুণেরও বেশি করার আশা করছে এএমডি। একই সময়ে এআই গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ থেকে আয় ১০০ শতাংশেরও বেশি বাড়ার প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফিজিক্যাল এআইয়ের বিকাশে সিলিকন ভ্যালিতে রোবোটিকস নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মানুষের মতো চলাফেরা করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবটকে বাড়ি ও কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রে বর্তমানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
চুক্তির পর এএমডির প্রধান বিজ্ঞানী এবং নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন ফেই-ফেই লি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তিনি জানিয়েছেন, তার লক্ষ্য হবে একটি শীর্ষস্থানীয় ফ্রন্টিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
লিংকডইনে লি লিখেছেন, হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, প্ল্যাটফর্ম এবং সবার জন্য উন্মুক্ত মডেলকে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও উন্মুক্ত এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস