ডায়াগনস্টিক রিপোর্টে চিকিৎসকের স্বাক্ষর রোগীর জন্য একটি ভরসার প্রতীক, যা নিশ্চিত করে যে একজন যোগ্য পেশাদার ল্যাব টেস্টের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন অনুমোদন করেছেন। তবে রিপোর্টটি যদি এমন কোনও প্যাথলজিস্টের নামে ইস্যু করা হয় যিনি সংশ্লিষ্ট নমুনাসমূহ, স্লাইড কিংবা পরীক্ষালব্ধ ফলাফল কখনোই দেখেননি?
চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ভারতের ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (এনএমসি) ১৩ অক্টোবর একটি স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এই প্রশ্নটি আরও ঘনীভূত হয়েছে। এনএমসি জানিয়েছে, এনএমসি আইন ২০১৯ বা এর নীতিমালায় নিবন্ধিত চিকিৎসকদের ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে দূর থেকে ল্যাবরেটরি, প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্ট পর্যালোচনার ওপর কোনও আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে শর্ত হলো, দূরবর্তী অনুমোদন কেবল তখনই বৈধ হবে যখন চিকিৎসক রোগীর ক্লিনিক্যাল তথ্য ও সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে প্রতিবেদনটি অনুমোদনের উপযুক্ত বলে মনে করবেন। তথ্য অপর্যাপ্ত হলে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা না হওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত রাখতে হবে।
কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় এ বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করা পোর্ট ব্লেয়ারের প্যাথলজিস্ট ড. অনন জয়সওয়াল বলেন, সর্বশেষ সার্কুলারে কেবল কোন পরিস্থিতিতে দূরবর্তী অনুমোদন দেওয়া যাবে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই ভূতুড়ে স্বাক্ষরকারী বা অন্যের লগইন আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয় না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন চিকিৎসক দূর থেকে সঠিকভাবে তথ্য পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়টিকে ল্যাবরেটরিগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো প্যাথলজিস্টের নাম ব্যবহারের সঙ্গে মেলানো যাবে না।
প্যাথোলজিস্টদের মূল কাজ কেবল নামে স্বাক্ষর দেওয়া নয়। টেস্টের ধরন অনুযায়ী ল্যাব ফলাফল পর্যালোচনা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার পর রিপোর্ট প্রকাশ করা তাদের দায়িত্ব। অভিযোগ উঠেছে, ভারতের কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিকিৎসকদের পর্যালোচনা ছাড়াই তাদের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ডিজিটাল রিপোর্ট প্রিন্ট করছে।
ড. জয়সওয়ালের মতে, একজন প্যাথলজিস্টের পরিচয়পত্র একই সময়ে একাধিক শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর রোগীরা পাচ্ছেন অমূল্যায়িত রিপোর্ট। এতে ভুল নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ছে।
ভারতের ন্যাশনাল অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড ফর টেস্টিং অ্যান্ড ক্যালিব্রেশন ল্যাবরেটরিজ (এনএবিএল)-এর পর্ষদ সদস্য এবং দিল্লির ডক্টর ডাংস ল্যাব-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নবীন ডাং বলেন, ডায়াগনস্টিক খাতে এই অনিয়ম ব্যাপক রূপ নিয়েছে এবং আমরা বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি তুলে ধরছি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ছোট বা অনুমোদনহীন ল্যাব ছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকার কর্মচারীদের স্বাস্থ্য প্রকল্প (সিজিএইচএস)-এর তালিকাভুক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও এ জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের নিয়ম অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে থাকা কেন্দ্রগুলোর শতভাগ এনএবিএল অ্যাক্রিডিটেশন থাকা বাধ্যতামূলক।
ড. জয়সওয়ালের হিসাব মতে, ভারতে প্রায় তিন লাখ ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি রয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৫০০টিরও কম এনএবিএল অনুমোদিত। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পোর্ট ব্লেয়ারে মাত্র ৩ জন প্যাথলজিস্টের বিপরীতে প্রায় ৪০টি নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এত বিপুল ঘাটতির কারণে কিছু স্বাক্ষর দিয়ে একাধিক কেন্দ্র চালানোর সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।
এনএবিএল-এর মূল প্রতিষ্ঠান কোয়ালিটি কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (কিউসিআই) স্বীকার করেছে যে অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও দ্বারা রিপোর্ট অনুমোদন অনিয়মের শামিল। তবে কিউসিআই জানিয়েছে, এনএবিএল একটি ঐচ্ছিক অ্যাক্রিডিটেশন সংস্থা, কোনও আইনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়। কোনও অনিয়ম হলে তা আইনিভাবে দেখার দায়িত্ব রাজ্য সরকারগুলোর।
এনএমসি নিয়ম তৈরি করে, এনএবিএল ল্যাবগুলোর পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা করে এবং সিজিএইচএস রিপোর্টের অর্থ প্রদান করে। তবে রিপোর্টে যার নাম রয়েছে, সেই চিকিৎসক আদৌ সেটি দেখেছেন কি না তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট কোনও একক কর্তৃপক্ষ নেই।
ড. জয়সওয়াল আক্ষেপ করে বলেন, এই শূন্যতা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রিপোর্টের ওই স্বাক্ষরটি এমন একটি প্রতিশ্রুতি হয়েই থাকবে, যা কেউ কখনও পরীক্ষা করে দেখে না।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে