পারিবারিক সুরক্ষা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা অনলাইন বেবি মনিটর হিসেবে ব্যবহৃত সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নতুন নজরদারি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল থেকে শুরু করে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে বেসামরিক নাগরিকদের ইন্টারনেটে যুক্ত ক্যামেরা হ্যাক করে প্রতিপক্ষের সেনা সদস্যদের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ, নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং হামলার ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে যুক্ত আনুমানিক ১২০ কোটি ক্যামেরা রয়েছে, যার একটি বড় অংশই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া ব্যবহৃত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই প্রবণতাকে বেসামরিক নজরদারি ব্যবস্থাকে যুদ্ধকালীন গোয়েন্দা তথ্যে রূপান্তর বলে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা সংস্থা ও হ্যাকাররা প্রতিনিয়ত ইন্টারনেটে দুর্বল সিকিউরিটির ক্যামেরা খুঁজছে এবং লাখ লাখ পাসওয়ার্ড ট্রাই করে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে। এতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), যা সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট সামরিক তথ্য বের করে আনছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২২ সালে ইউক্রেন সমর্থক আন্তর্জাতিক হ্যাকার দল টিম ওয়ানফিস্ট সেভাসতোপোলের একটি ক্যামেরা হ্যাক করে রাশিয়ান সামরিক হেলিকপ্টারের গতিবিধি অনুসরণ করে একটি গোপন সামরিক ঘাঁটির সন্ধান পায়। ইউক্রেনীয় বাহিনী সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হামলা চালিয়ে রাশিয়ার এয়ার ডিফেন্স ও যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে কিয়েভের বিভিন্ন বাসাবাড়ির ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিশানা নিখুঁত করেছিল রুশ হ্যাকাররা। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা প্রায় ৪০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ক্যামেরা ব্লক বা স্থানান্তরিত করেছে।
সামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি হ্যাক করা ক্যামেরাগুলো তথ্যযুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসরায়েল-বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ইরানের সঙ্গে যুক্ত হ্যাকার দল হান্দালা সাধারণ ইসরায়েলিদের ঘরের ভেতরের ফুটেজ দেখিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। এছাড়া মিটিংয়ে অনুপ্রবেশ করে আপত্তিকর বক্তব্য বা বিভ্রান্তি তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। ইউক্রেনীয় হ্যাকাররা সম্প্রতি রাশিয়ার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের অনলাইন মিটিং এবং সেনা নিয়োগ প্রক্রিয়ার লাইভ স্ট্রিমিংয়ে অনুপ্রবেশ করে তা পণ্ড করে দেয়।
যুদ্ধের ময়দান বা সরকারি অফিস ছাড়িয়ে এই হুমকি এখন সাধারণ মানুষের শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ২০২৩ সালে প্রাগের বাসিন্দা অনদ্রেজ স্বোবোদা নামের এক ব্যক্তি তার ছোট সন্তানদের গল্প শোনানোর সময় দেখতে পান যে তাদের বেবি মনিটরটি হ্যাক হয়েছে এবং সেখান থেকে অপরিচিত গান ও কথা ভেসে আসছে। পেশায় সাইবার নিরাপত্তা কর্মী হওয়া সত্ত্বেও স্বোবোদা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, আমি কখনোই ভাবিনি আমার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পরে তিনি ক্যামেরার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত এই দুর্বলতা সাধারণ মানুষকে না জানিয়েই তাদের অজান্তে যুদ্ধের অন্যতম অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলছে।