বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যে কর সংক্রান্ত কোনও নীতিমালা নেই। এ কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এদিকে, কোনও ইউনিফাইড ট্যাক্স সিস্টেম না থাকার কারণে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কোম্পানিগুলো বেশি দামি সিগারেট কম মূল্যস্তরে দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্র থেকে জানা যায়, বেসরকারি একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি মূল্যস্তর কম দেখিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় ফাঁকি দেয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই টাকা পরিশোধের নির্দেশও দেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে বিদ্যমান করকাঠামো অত্যন্ত জটিল। এ কারণেই তামাক কোম্পানিগুলো কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। এ কারণে করের স্তর প্রথা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেন তারা।
কর স্তর প্রথা সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে তামাকজাত পণ্যে বিদ্যমান মূল্যস্তর প্রথা তুলে দিয়ে একটি একক করকাঠামো নির্ধারণ করার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা সেদিকে মনে হয় না খুব বেশি কান দেন। তারা যদি আমাদের কথা একটু বোঝার চেষ্টা করতেন, তাহলে তামাক কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিতে পারতো না। তিনি বলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির সমানুপাতে তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়েনি, বাড়েনি কর। তাই তামাকসেবীদের সংখ্যা বেড়েছে। আমরা আশা করি, সরকার এদিকে বিশেষ নজর দেবে, তামাকজাত পণ্যের মূল্যস্তর প্রথা উঠে যাবে।
গত ৩০-৩১ জানুয়ারি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক সাউথ এশিয়ান স্পিকারস সামিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাকের ব্যবহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। তামাকের বর্তমান শুল্ক কাঠামো সহজ করে শক্তিশালী তামাক শুল্কনীতি গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থমন্ত্রীও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশনা দেন।
সব ধরনের তামাক পণ্যে ইউনিফায়েড ট্যাক্স সিস্টেম অতি গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব) ডা. আব্দুল মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তা না হলে মানুষ দাম বেশি হলে এক ব্র্যান্ড থেকে আরেক ব্র্যান্ডে যেতে পারে। মানুষের এই শিফট করাকে থামাতে হলে বিদ্যমান কর কাঠামো তুলে দিয়ে একক কর কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। দাম বেড়ে ক্রয় ক্ষমতার বাইরে গেলেই কেবল মানুষ তামাক বাদ দিতে পারে। একই সঙ্গে সরকারও রাজস্ব পাবে বেশি।
সিটিএফকে (ক্যাম্পেইন ফর টোবাক্যো ফ্রি কিডস)-এর কনসালটেন্ট শরীফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যদি কোনও কর সংক্রান্ত নীতিমালা বাংলাদেশে থাকতো, তাহলে সেই নীতি অনুসরণ করে কর বাড়তো। তামাকের ব্যবহারও কমে যেত। তিনি বলেন, ৩ বছরের মধ্যে সব কর স্তর প্রথা তুলে দেওয়ার জন্য রাজীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেন অর্থমন্ত্রী গত ২৪ মার্চ। কিন্তু এটি নিয়ে সরকার কোনও ঘোষণা এখনও দেয়নি। এখন সরকার যতক্ষণ না এর ঘোষণা না দিচ্ছে, ততক্ষণ এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হলো, নীতিমালা না থাকার কারণে, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে যেমন-জর্দা-গুলে একরকম কর, সিগারেটে মূল্যস্তর প্রথা, বিড়ির ক্ষেত্রে আরেক রকম অতি স্বল্পমাত্রার ট্যারিফ-ভ্যালু প্রভৃতি নানারকম করারোপ পদ্ধতি জটিলতার সৃষ্টি করে।
আরও পড়তে পারেন: বাজেট বাড়লেও ৮ বছর ধরে কমছে বেসরকারি বিনিয়োগ
হয়তো এনবিআর থেকে নামেমাত্র করারোপ করা হয় জানিয়ে শরীফুল আরম বলেন, কিন্তু তার প্রতিফলন বাস্তবে সেভাবে হয় না।যেমন-ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ক্রেতা শতকরা ২৭ শতাংশ, এ হার সিগারেটের হারের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু কর আসে এক শতাংশেরও কম। এটা কর সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকার কারণেই এ ঘটনা হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করি, সরকার তামাকজাত পণ্যের জন্য একটি নীতিমালা করবে এবং সেই নীতিমালা অনুসরণ করে এমনভাবে কর ধার্য করবে, যেন এসব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
এদিকে, গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশ বিড়ি শিল্পমালিক সমিতি এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করে আসন্ন বাজেটে বিড়ির ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমানো, সিগারেটের চতুর্থ বিন্যাস বাতিল অথবা প্রতি শলাকা সিগারেটের সর্বনিম্ন মূল্য ৫ টাকা নির্ধারণ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসি আর্টিকেল-এর ৬ ধারা মেনে সিগারেটের সর্বনিম্ন শুল্ক ৭০ শতাংশ নির্ধারণ এবং বিড়ির ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর বাতিলের দাবি জানিয়ে ক্ষুদ্র শিল্পের নামকরণ করে সুপারিশ করেছে। এদিকে, বিড়ি শিল্প মালিকরা রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্টদের ভুল বুঝিয়ে বিড়ির ওপর ট্যাক্স না বসাতে প্রভাবিত করে থাকেন। বিড়ি শিল্প কর্মসংস্থানের এবং জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় দাবি করে বিড়ি মালিক সমিতি সবসময়ই সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে জানিয়ে তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২৫ লাখের বেশি কর্মী বিড়ি শিল্পে নিয়োজিত বলে থাকেন তারা। অথচ ক্যাম্পেন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এর সহায়তায় পরিচালিত এক জরিপে পাওয়া গেছে, ৩১টি জেলায় ১১৭টি বিড়ি কারখানা চালু আছে। এসব কারখানায় প্রত্যক্ষভাবে ৬৫ হাজার এবং পরোক্ষভাবে কাজ করাসহ মোট শ্রমিকের সংখ্যা তিন লাখের মতো। মোট শ্রমশক্তির শূন্য দশমিক এক ভাগ হচ্ছেন বিড়ি শ্রমিক। এরই মধ্যে ২০১৬-২০১৭ বাজেটকে সামনে রেখে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো মানববন্ধন করেছে কয়েকবার। সেখানে তারা বলেছেন, সিগারেটের করারোপের জন্য ব্যবহৃত মূল্যস্তর প্রথা তুলে দিতে হবে কারণ, এই মূল্যস্তর কর ফাঁকির অন্যতম হাতিয়ার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অন্যতম বহুজাতিক তামাক কোম্পানি (বিএটিবি) মধ্যম স্তরের সিগারেটকে নিম্নস্তর দেখিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
/এমএনএইচ/








