বাজেট বাড়লেও ৮ বছর ধরে কমছে বেসরকারি বিনিয়োগ

গোলাম মওলা
০১ জুন ২০১৬, ২২:৪৮আপডেট : ০২ জুন ২০১৬, ১২:২০

প্রতীকী ছবি প্রতিবছরই বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না বেসরকারি বিনিয়োগ। বরং দিন দিন কমছে। এ কারণে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। যার ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গেল ৮ অর্থবছরে বাজেটের আকার আড়াই লাখ কোটি টাকা বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ ১ শতাংশও বাড়েনি।
সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সেই অর্থ বছরের বাজেট ছিল ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। ৮ বছর পরে বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ এই ৮ বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ শতাংশের ঘরেই হাবুডুবু খাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিবিএসের হিসাবে, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের (সাময়িক) শেষে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে দাঁড়াবে জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত কয়েক বছর বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। এ কারণে বাড়েনি কর্মসংস্থানও।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি। আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে যেসব কৌশল নেওয়া দরকার, বাজেটে তার দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি।

বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের যে বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন তার আকার ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এক বছরে বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর ৮ বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।

বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করলেও জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমছে। বিবিএসের হিসাবে এবার চলতি বাজারমূল্যে জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গেল অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ না বাড়ায় কমে গেছে কর্মসংস্থানও। বিবিএসের প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, গেল দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। এর ফলে প্রতি বছর বেকার হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ। সেই হিসাবে দুই বছরে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ।

আরও পড়ুন: আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা, কী আছে ভ্যাট আইনে?

অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্ক, আইপিএনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসে। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পায় মাত্র ২ লাখ মানুষ। গেল দুই বছরে অর্ধকোটি মানুষ বেকার থাকছে। যদিও গেল দেড় বছর ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল না বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিনিয়োগের অন্যতম শর্ত হচ্ছে অনুকূল পরিবেশ। কিন্তু এখন পর্যন্ত উদ্যোক্তারা সেই নিশ্চয়তা পায়নি। বিদ্যুতে কিছুটা উন্নতি হলেও গ্যাসের সমস্যা এখনও প্রকট। এছাড়া এখনও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছেই। বিদেশি খুনসহ বিভিন্নভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপন্ন হচ্ছে। এসব কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।

বিনিয়োগ যে এখনও কমছে তার প্রমাণ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিলের চেয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ কমে গেছে। পাশাপাশি কমে গেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের উল্লিখিত সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি (লেটার অব ক্রেডিট বা ঋণপত্র) নিষ্পত্তির হার ছিল ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তির হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে সোয়া ১২ শতাংশে। অর্থাৎ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমার পাশাপাশি কমে গেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও।
বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও যে স্থবির তা আরও জোরালো হয় ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থেকেই। এখনও ব্যাংকের তহবিলে পড়ে আছে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে একেবারে অলস পড়ে আছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এ তিন মাসে বিনিয়োগ বোর্ডে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে ৪০৯টি। এর বিপরীতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। গেল বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর ৩ মাসে নিবন্ধিত ৩৭৬টি প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ এসেছিল ২০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়।

বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা আর প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয় ৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেট ২ লাখ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ওই অর্থবছরের ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটির বাজেটে প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অবশ্য বিবিএসের সাময়িক হিসাবে, চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে।

তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলেও বাজেটের আকার প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ১লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন: এমপি মোস্তাফিজুরের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত ইসির

এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে দিতে হবে না বাড়তি দাম
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে দিতে হবে না বাড়তি দাম
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের